দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রত্যাশার পর অবশেষে আখের সরকারি মূল্য বাড়ানো হয়েছে। ২০২৬-২০২৭ মাড়াই মৌসুম থেকে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন চিনিকলগুলোতে মিলগেটে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম ৬২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫১ টাকা এবং বহিঃকেন্দ্রে ৬১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৩৭ টাকা ৪৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাড়াই মৌসুমের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগে আখ সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত মূল্য এবং ৮ শতাংশের বেশি চিনি আহরণ হলে প্রিমিয়াম দেয়ার ব্যবস্থাও বহাল রাখা হয়েছে। বীজ আখের দামও বাড়ানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিশেষ করে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডকে ঘিরে যেসব আখচাষি দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য মূল্য ও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন, তাদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। কারণ আখের দাম শুধু একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণের বিষয় নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আস্থা, চিনিকলের কাঁচামাল সরবরাহ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ। বাস্তবতা হলো, কৃষক কোনো ফসল আবাদ করেন কেবল আবেগ দিয়ে নয়, লাভ-লোকসানের হিসাব করেই। উৎপাদন খরচ বাড়লে এবং বাজারদর সেই অনুপাতে না বাড়লে কৃষক স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকবেন। আখের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। দীর্ঘসময় ধরে আখের সরকারি মূল্য ও উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধান নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। ফলে আখের আবাদ কমে গেলে চিনিকলগুলোও পড়েছে কাঁচামালসংকটে। পর্যাপ্ত আখ না পেলে মিলের মাড়াই সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না, উৎপাদন কমে, বাড়ে লোকসানের ঝুঁকি। তাই আখের দাম বৃদ্ধি একই সঙ্গে কৃষক ও চিনিকল দুই পক্ষের স্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কেরুর জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত অধিকাংশ চিনিকল যখন নানা সংকট ও লোকসানের চাপে, তখন দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক সাফল্যের যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, তা ধরে রাখতে হলে সবচেয়ে আগে নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত আখের জোগান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেরু চিনিকলের সর্বসাকল্যে ২৬৫ কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জনের তথ্য প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এই সাফল্যকে টেকসই করতে হলে কৃষকের সঙ্গে চিনিকলের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। এখানে কেরুর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আখচাষিদের সঙ্গে উঠান বৈঠক, মতবিনিময় ও সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের সমস্যাগুলো শোনা এবং আখের দাম বাড়ানোর দাবি সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। কৃষককে কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাকে চিনিশিল্পের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষকের আস্থা অর্জন করতে পারলে চিনিকলও তার সুফল পাবে। তবে কুইন্টালপ্রতি ২৬ টাকা মূল্যবৃদ্ধিকে চূড়ান্ত সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। কৃষকের উৎপাদন খরচ, সার-বীজ-কীটনাশকের দাম, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুত, সেচ ও পরিবহন ব্যয় সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিতভাবে আখের মূল্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মূল্য নির্ধারণে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, উৎপাদন ব্যয়ের বাস্তব চিত্র ও কৃষকের ন্যায্য মুনাফাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে চিনির বাজার ও চিনিকলের উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। আখের দাম বাড়বে, কিন্তু উৎপাদিত চিনির বাজারে ন্যায্য মূল্য, বিপণনব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে না এমন হলে দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য তৈরি হবে না। তাই কৃষক, চিনিকল ও সরকার—তিন পক্ষের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। আখের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি চিনিশিল্পকে আধুনিক, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করাও সময়ের দাবি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ইক্ষু রোপণ মৌসুম শুরু হচ্ছে। নতুন মূল্যকে কাজে লাগিয়ে এ অঞ্চলের কৃষকেরা যদি আখের আবাদ বাড়ান, তবে কেরুর জন্য তা হতে পারে বড় সুযোগ। কিন্তু শুধু মূল্য ঘোষণা করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে চাষিদের কাছে নতুন মূল্য, প্রিমিয়াম, বীজ আখের দাম ও অন্যান্য সুবিধার তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, মাইকিং, সভা ও উঠান বৈঠকের যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, তা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃষকের দোরগোড়ায় তথ্য পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি আখ সরবরাহ, ওজন, মূল্য পরিশোধ ও পরিবহন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে আখের মূল্য পরিশোধে কোনো ধরনের বিলম্ব কৃষকের উৎসাহ নষ্ট করতে পারে। কৃষক ফসল বিক্রি করে দ্রুত অর্থ পেতে চান এটাই স্বাভাবিক। তাই আখ সরবরাহের পর নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধ নিশ্চিত করা, ওজন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা রাখা এবং কৃষকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কারণ একটি ভালো মূল্য ঘোষণার চেয়েও কৃষকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই মূল্য বাস্তবে, স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং সময়মতো পাওয়া। কেরু ও আখচাষির সম্পর্ক সত্যিই একই সুতোয় বাঁধা। কৃষক লাভবান হলে জমিতে আখ থাকবে; জমিতে আখ থাকলে কেরুর মাড়াই চলবে; মাড়াই বাড়লে উৎপাদন বাড়বে; উৎপাদন বাড়লে প্রতিষ্ঠানের আয় ও মুনাফা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর একটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু সরকারকেই রাজস্ব দেবে না, এর সঙ্গে যুক্ত হাজারো কৃষক, শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে। তাই আখের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এই সিদ্ধান্তের সার্থকতা নির্ভর করবে মাঠে এর প্রতিফলনের ওপর। কৃষকের আয় ও আস্থা যদি বাড়ে, আখের আবাদ যদি বাড়ে এবং কেরু যদি পর্যাপ্ত কাঁচামাল পেয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারে, তবেই এই মূল্যবৃদ্ধি সত্যিকার অর্থে সফল হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কৃষককে টিকিয়ে রাখতে হবে। আর কৃষকের হাতে লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারলেই আখের মাঠ আবারও সমৃদ্ধ হতে পারে। কেরুর সাম্প্রতিক সাফল্য সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সঠিক নীতি, সময়োপযোগী মূল্য, কৃষকবান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আখের দাম বাড়ানোর মধ্য দিয়ে যে আশার আলো জ্বালানো হয়েছে, সেটি যেন আগামী মৌসুমে আখের সবুজ ক্ষেতে বাস্তব সাফল্যের রূপ নেয় এটাই প্রত্যাশা।


