নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা শহরের উপশম নার্সিং হোমে পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের সময় রবগুল মোল্লা (৪৮) নামের এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গতকাল শনিবার বিকেলে অস্ত্রোপচারের সময় তার মৃত্যু হয়েছে বলে স্বজনেরা দাবি করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্লিনিকটিতে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর ক্ষুব্ধ স্বজনেরা ক্লিনিকে ভাঙচুর করেন বলে জানা গেছে। নিহত রবগুল মোল্লা চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সুবদিয়া গ্রামের খেজমত মোল্লার ছেলে।
স্বজনদের ভাষ্য, পিত্তথলিতে পাথরের অস্ত্রোপচারের জন্য শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে রবগুল মোল্লাকে উপশম নার্সিং হোমে ভর্তি করা হয়। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তাকে অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। সেখানে ক্লিনিকের মালিক ও চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এহসানুল হক তন্ময় অস্ত্রোপচার শুরু করেন। স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের একপর্যায়ে রবগুল মোল্লার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং অপারেশন টেবিলেই তার মৃত্যু হয়। তাদের আরও অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসক ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক তাকে অপারেশন থিয়েটারে রেখে সেখান থেকে চলে যান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
নিহতের বোন সখেনা খাতুনও অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক তন্ময়কে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। পরে তিনি অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে যান। রবগুল মোল্লার মৃত্যুর খবর স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই উপশম নার্সিং হোম এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। স্বজন ও স্থানীয় লোকজন ক্লিনিকের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ স্বজনেরা দফায় দফায় ক্লিনিকে ভাঙচুর করেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বাধা দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ ক্লিনিক এলাকায় নজরদারি বাড়ায়।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মারুফ রহমান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঘটনার পর রবগুল মোল্লার মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ রবিবার তার দাফন হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে আজ রবিবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে নিহতের পরিবারের সদস্য ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এছাড়া ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উপশম নার্সিং হোম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ইতোমধ্যে ক্লিনিকটিতে ভর্তি থাকা রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে শনিবার রাত থেকেই ক্লিনিকটির চিকিৎসাসেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। পুলিশি নজরদারিতে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নিহতের স্বজনেরা চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং অ্যানেসথেশিয়া ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির অভিযোগ তুলেছেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে রবগুল মোল্লার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা বা চিকিৎসাগত ত্রুটি ছিল কী-না তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। চিকিৎসা-সংক্রান্ত এমন ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে রোগীর চিকিৎসা নথি, অস্ত্রোপচারের বিবরণ, অ্যানেসথেশিয়ার রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শরিফুজ্জামান শরীফ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরে তিনি জানান, মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রবিবার নিহতের পরিবারের সঙ্গে বসে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে ঘটনার সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, রবগুল মোল্লার আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনেরা বলছেন, চিকিৎসা নিতে গিয়ে একজন মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই অনিষ্পন্ন প্রশ্ন হয়ে থাকতে পারে না। তারা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চান।


