দামুড়হুদা অফিস:
দামুড়হুদা উপজেলার হাউলি ইউনিয়নের ডুগডুগি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর চলার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, একাধিক স্থানে পালা করে বসানো এসব জুয়ার আসরে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতবদল হচ্ছে। জুয়ার নেশায় অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় চুরি ও অন্যান্য অপরাধও বাড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে এক-দুই দিনের জন্য জুয়ার আসর বন্ধ হলেও পরে আবার একই চিত্র দেখা যায়। ফলে দীর্ঘদিনের এই জুয়ার আসর স্থায়ীভাবে বন্ধ না হওয়ায় হতাশ এলাকাবাসী। তারা জুয়া বন্ধে চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাউলি ইউনিয়নের ডুগডুগি, লোকনাথপুর, তারিণীপুরসহ আশপাশের প্রায় ছয়টি স্থানে বিভিন্ন সময়ে জুয়ার আসর বসে। এসব আসরে তরুণ-যুবক থেকে শুরু করে বয়স্ক বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি আসরে দিনে প্রায় দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। সেই হিসাবে মাসে জুয়ার আসরে কয়েক দশ লাখ থেকে কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতবদল হয়ার অভিযোগ তাদের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জুয়ার আয়োজকেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এক জায়গায় নিয়মিত আসর না বসিয়ে স্থান পরিবর্তন করে থাকেন। একদিন ডুগডুগি, অন্যদিন লোকনাথপুর এভাবে বিভিন্ন মাঠে বসানো হয় জুয়ার আসর।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, লোকনাথপুর-কাদিপুর, তারিণীপুর, ইটভাটার পেছনের এলাকা, ডুগডুগি শ্মশানঘাট, ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন এলাকা এবং দর্শনা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পাশের মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে জুয়ার আসর বসার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি জানান, বহু বছর ধরে হাউলি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জুয়া চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার শুরু হয়। তার দাবি, আয়োজক বা পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের পরিবর্তন হলেও জুয়ার আসর বন্ধ হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, জুয়ার আসরে আসা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গতিবিধি নজরদারিতে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। খেলার স্থান থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকেই প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকায় লোকজন দিয়ে নজরদারি করা হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুপুর সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার দিকে বিভিন্ন চায়ের দোকান ও নির্ধারিত স্থানের আশপাশে জুয়ারিরা জড়ো হতে শুরু করেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা অপরিচিত কেউ এলাকায় ঘোরাফেরা করছে কী-না, তা নজরদারি করা হয়। পরিস্থিতি নিরাপদ মনে হলে জুয়ারিদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়ার আসরে টাকা শেষ হয়ে গেলে কেউ কেউ মুঠোফোন, মোটরসাইকেল এমনকি স্বর্ণালংকারের মতো মূল্যবান সামগ্রী বন্ধক রেখেও খেলায় অংশ নেন। এতে জুয়ার নেশা শুধু ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতিই করছে না, পরিবারের ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। জুয়ার আয়োজক হিসেবে চাঁদ আলী, ওমিদুল ও নুরু কানার নাম স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ও সচেতন মহলের লোকজন বলছেন, জুয়ার কারণে শুধু অর্থের অপচয় হচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সামাজিক জীবনে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, পারিবারিক বিরোধ ও মারামারির মতো অপরাধ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জুয়ার আসর বন্ধ করা হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অভিযানের পর কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর আবার আগের মতোই আসর বসে। ফলে জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। তাদের দাবি, ডুগডুগি ও আশপাশের এলাকায় জুয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে শুধু জুয়ার আসরে অভিযান চালালেই হবে না; এর সঙ্গে জড়িত আয়োজক, অর্থের জোগানদাতা ও সহযোগীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জুয়ার আসর বসানোর স্থানগুলোতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানান তারা।
দামুড়হুদা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মেজবাহ উদ্দীন বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত জুয়া খেলার মূল হোতাদের ধরার চেষ্টা করছি। অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, বিচ্ছিন্ন অভিযানের পরিবর্তে জুয়ার আসর পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এতে দীর্ঘদিনের জুয়ার প্রবণতা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি জুয়া ঘিরে তৈরি হওয়া অন্যান্য অপরাধও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন তারা।


