শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। সেখানে শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা নেবেÑএটাই প্রত্যাশিত। অথচ আলমডাঙ্গার একটি মাদ্রাসায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে এক শিক্ষককে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার ঘটনায় উদ্বেগের পাশাপাশি নতুন করে সামনে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা ও অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের প্রশ্ন। ঘটনাটি সত্যিই উদ্বেগজনক। অভিযোগকারী ছাত্রীর বাবার দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে তার মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিতেন এবং বুধবার রাতে মাদ্রাসায় তাকে জোরপূর্বক শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন ওই শিক্ষকের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাকে আটক করে পুলিশে খবর দেন। এ সময় তাকে গণধোলাই দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষকের বাবা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। পুলিশও জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্তাধীন, তদন্তের পরই প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। এ ঘটনায় দুটি বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। প্রথমত, একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে সেটিকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী শিশুকে সামাজিক চাপ, ভয়ভীতি কিংবা মানসিক আঘাত থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। শিশুর পরিচয় প্রকাশ না করা, তার বক্তব্য গ্রহণের সময় সংবেদনশীলতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করাও জরুরি। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কাউকে গণধোলাই দেয়া বিচার নয়; বরং এটি নিজেই আরেকটি অপরাধের জন্ম দিতে পারে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার। জনতার হাতে বিচার ছেড়ে দিলে প্রকৃত অপরাধী যেমন পার পেয়ে যেতে পারে, তেমনি নিরপরাধ কেউ অন্যায়ভাবে শাস্তির শিকারও হতে পারেন। এ ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑএকজন শিক্ষক প্রায় ১০ বছর ধরে ওই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এত দীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষকদের আচরণ এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কোনো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং নিয়মিত তদারকি থাকা জরুরি। বিশেষ করে মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, ভয়, উদ্বেগ বা কোনো ধরনের হয়রানির ইঙ্গিত দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে গুজব বা সামাজিক উত্তেজনার ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন। আলমডাঙ্গার এ ঘটনার ক্ষেত্রে তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত জরুরি। অভিযোগ সত্য হলে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে আর অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়বিচার ও সম্মান পুনরুদ্ধারের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গণধোলাইয়ের অভিযোগ থাকলে সেটিও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা যেমন রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রাধিকার, তেমনি আইনের শাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের ক্ষেত্রে শিশুর সুরক্ষা, তদন্তে নিরপেক্ষতা এবং বিচারে আইনের শাসনÑএই তিনটি নিশ্চিত হলেই কেবল এমন ঘটনা থেকে সমাজে আস্থা তৈরি হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হতে হবে নিরাপদ; আর ন্যায়বিচারের পথ হতে হবে আদালত ও আইন, জনতার হাত নয়।


