নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত শহর দর্শনার শ্যামপুর গ্রামের মেয়ে এলিজা আজাদ রহমান টুম্পা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের জায়গায় উঠে এসেছেন। সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যামডেন কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই নারী। অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে কোনো বাংলাদেশি নারী হিসেবে তার ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে ক্যামডেন সিটি কাউন্সিলকক্ষে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভায় কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে এলিজা আজাদ রহমান ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। একই সভায় ভিন্স ফেরেরি মেয়র নির্বাচিত হন। এলিজার এই সাফল্যের খবরে তার জন্মস্থান চুয়াডাঙ্গার দর্শনা ও আশপাশের এলাকায় আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশিষ্টজনেরা বলছেন, সীমান্তবর্তী একটি শহরের গ্রামের মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছানো শুধু পরিবারের জন্য নয়, পুরো চুয়াডাঙ্গার জন্যও গর্বের।
এলিজা আজাদ অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ২০২৪ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে ক্যামডেন কাউন্সিলের নর্থ ওয়ার্ড থেকে প্রথমবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার দুই বছরের মধ্যেই ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পাওয়া তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় সরকারে কাজ করতে গিয়ে নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যা, উন্নয়ন ও কমিউনিটির নানা প্রয়োজন নিয়ে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। এবার সেই দায়িত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো।
ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর এলিজা আজাদ বলেন, দলীয় সমর্থনের পাশাপাশি কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে এই দায়িত্ব পাওয়ায় তার ওপর স্থানীয় নাগরিকদের আস্থা ও দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে তার কাজের পরিধিও আগের তুলনায় অনেক বাড়ল। এলিজা আজাদ রহমানের পারিবারিক শেকড় চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পৌর এলাকার শ্যামপুর গ্রামে। তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আজাদুল ইসলাম আজাদ। ছোট মেয়ে এলিজা দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় আগে শিক্ষার্থী হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান এলিজা। পরে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে ধীরে স্থানীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন এবং মাত্র দুই বছরের মধ্যে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পেলেন।
এলিজা আজাদের বাবা আজাদুল ইসলাম আজাদ মেয়ের এই অর্জনে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর আগে কাউন্সিলর হিসেবে যাত্রা শুরু করে এলিজা এবার ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। মেয়ের জন্য তিনি দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে একজন বাংলাদেশি হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করা সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন এলিজা আজাদ। তবে দৃঢ়তা, পরিশ্রম ও মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেই পথ তৈরি করেছেন তিনি। এলিজা মনে করেন, নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বে আরও বেশি করে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তার নিজের পথচলাও অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠুকÑএমন প্রত্যাশা তার। এই দীর্ঘ যাত্রায় স্বামী, সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন স্থানীয় সাংস্কৃতিক কমিউনিটির মানুষের সমর্থনও পেয়েছেন বলে জানান এলিজা। তাদের সমর্থন ও উৎসাহকে নিজের পথচলার বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন তিনি।
এলিজা আজাদ রহমান ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় দর্শনা ও চুয়াডাঙ্গার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে গর্ব ও উচ্ছ্বাস। স্থানীয়রা বলছেন, সীমান্ত শহর দর্শনার একটি গ্রামের মেয়ের এই অর্জন প্রমাণ করেÑযোগ্যতা, মেধা ও নেতৃত্বের দক্ষতা থাকলে ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা হতে পারে না। দর্শনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মনিরুজ্জামান ধীরু বলেন, দর্শনার একটি গ্রামের মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গর্বের। মেধা, যোগ্যতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা থাকলে ভৌগোলিক সীমানা কোনো বাধা নয়Ñএলিজার সাফল্য তারই প্রমাণ।
মেয়ের এ অর্জনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে আজাদুল ইসলাম আজাদ বলেন, তার এই অর্জন আমার জন্য, পরিবারের জন্য এবং অবশ্যই বাঙালির জন্য গৌরবের। তিনি মেয়ের নতুন দায়িত্ব সফলভাবে পালনের জন্য আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে দোয়া কামনা করেন। তিনি ওই পোস্টে আরও বলেন, সবার দোয়া ও আল্লাহর সাহায্য যেন নতুন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে মেয়ের পাথেয় হয় এবং সে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে পরিবার ও দেশের মানুষের জন্য গৌরব বয়ে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এলিজার এই অর্জন দর্শনার তরুণ প্রজন্মের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। বিদেশের মাটিতে গিয়ে একজন বাংলাদেশি নারী শুধু নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেননি, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নেতৃত্বের পর্যায়েও জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে আরও দৃশ্যমান করবে বলে তারা মনে করছেন। সিডনির ডেনহ্যাম কোর্টের বাসিন্দা বোরহান খান লিমন বলেন, এলিজা আজাদ দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করছেন। স্থানীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরার পাশাপাশি সামগ্রিক উন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব অবশ্য নতুন নয়। এর আগে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সুমন সাহা সিডনির কাম্বারল্যান্ড সিটি কাউন্সিল এবং মাসুদ খলিল ক্যাম্বেলটাউন সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আরেক বাংলাদেশি মাসুদ চৌধুরী ক্যাম্বেলটাউন সিটি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এলিজা আজাদ রহমানের অর্জনের বিশেষ তাৎপর্য হলোÑবাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন নারী হিসেবে তিনি অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সরকারে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্বে নির্বাচিত হয়েছেন। দর্শনার শ্যামপুর গ্রামের মেয়ে থেকে সিডনির ক্যামডেন কাউন্সিলের নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তার এই উঠে আসা তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের কাছেও গর্ব ও অনুপ্রেরণার নতুন গল্প হয়ে উঠেছে।


