শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চার জায়গা। আর পরীক্ষা সেই জ্ঞান ও যোগ্যতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সেখানে যদি অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের বই দেখে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি নিছক একটি পরীক্ষাকেন্দ্রের অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো এমন অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, তাদের আটকে রাখা এবং ব্যবহৃত মুঠোফোন ও বুম মাইক্রোফোন ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা চলাকালে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন নাগরিক টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি রাব্বি আহমেদ ও দৈনিক খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধি তারিক। তাদের অভিযোগ, ৫০০ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের বই দেখে পরীক্ষা লেখার সুযোগ দেয়ার তথ্য পেয়ে তারা পরীক্ষা কেন্দ্রে যান। সেখানে কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে বই খুলে পরীক্ষা দিতে দেখে বিষয়টি ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে দুই শিক্ষক তাদের বাধা দেন এবং একপর্যায়ে হামলা করেন। পরে তাদের একটি কক্ষে আটকে রাখা এবং দুটি মুঠোফোন ও একটি বুম মাইক্রোফোন নিয়ে নেয়ারও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তসাপেক্ষ। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সমীচীন নয়। তবে অভিযোগটি যেহেতু একই সঙ্গে পরীক্ষার স্বচ্ছতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং সাংবাদিকের পেশাগত স্বাধীনতা এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত, সেহেতু এর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত অপরিহার্য। পরীক্ষার হলে বই দেখে উত্তর লেখা যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে তা অত্যন্ত গুরুতর অনিয়ম। একজন পরীক্ষার্থীকে অন্যায্য সুবিধা দেয়ার অর্থ শুধু একজন শিক্ষার্থীকে সুবিধা দেয়া নয়, বরং যারা নিয়ম মেনে পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে অন্যায় করা। এর ফলে মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য কমে যায়। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, এ ধরনের অনিয়ম যদি অর্থের বিনিময়ে সংঘটিত হয়, তাহলে তা শিক্ষার পবিত্র উদ্দেশ্যকেই কলুষিত করে। একইভাবে, অনিয়মের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা তাদের পেশাগত কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগও কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সাংবাদিকের কাজ হলো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা এবং তা জনগণের সামনে তুলে ধরা। কোনো সাংবাদিকের কাজ নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে তার প্রতিকার চাইতে পারে। কিন্তু হামলা, মারধর, আটকে রাখা কিংবা সংবাদ সংগ্রহের সরঞ্জাম কেড়ে নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য পন্থা হতে পারে না। এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকেরা যদি কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ দেখতে পান, সেটি প্রকাশের আগে তাদেরও দায়িত্বশীল ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও মনে রাখতে হবে গণমাধ্যমের প্রশ্নকে শত্রুতার চোখে দেখলে সমস্যার সমাধান হয় না, বরং সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই পারে এমন পরিস্থিতি এড়াতে। গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার কথা বলেছেন। এটি আশাব্যঞ্জক। এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজেরও মিল রাখা। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, দ্রুত ও দৃশ্যমান। পরীক্ষাকেন্দ্রে সত্যিই কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, পরীক্ষার্থীরা বই দেখে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন কি না, অর্থের বিনিময়ে এমন সুযোগ দেয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাদের আটকে রাখার ঘটনা ঘটেছে কি না এবং তাদের সরঞ্জাম নেয়া হয়েছিল কী-না প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি। পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনেরও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। পরীক্ষার মতো স্পর্শকাতর কার্যক্রমে পর্যাপ্ত তদারকি না থাকলে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। তাই শুধু একটি ঘটনার তদন্ত নয়, ভবিষ্যতে পরীক্ষাকেন্দ্রে এমন অভিযোগ যাতে না ওঠে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ এবং কঠোর জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরীক্ষাকেন্দ্র হবে অনিয়মমুক্ত, সংবাদকর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন নির্বিঘ্নে—এটাই একটি দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা।


