আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰সাংবাদিকের ওপর হামলা, প্রশ্ন নিরাপদ সাংবাদিকতার📰গাংনী ও মুজিবনগরে পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ ৩ ব্যক্তি গ্রেপ্তার, আটক ২📰আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে এখন বিদ্যুৎ প্রকল্প📰জীবননগরে রাতের আঁধারে দুই কলাবাগান কলা চুরি📰চুয়াডাঙ্গায় দোকান মালিক সমিতির নতুন কমিটির শপথ ও অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত 📰চুয়াডাঙ্গার আজমুলকে ‘ভাত চুরির’ অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ📰সীমান্তে ঘুরে রাতের আঁধারে ফিরলেন শিক্ষকেরা📰চুয়াডাঙ্গা উপশম নার্সিং হোমে অপারেশন টেবিলে রোগীর মৃত্যু, ক্লিনিক ভাঙচুর📰আলমডাঙ্গাকে হারিয়ে ফাইনালে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা📰আলমডাঙ্গায় ট্রাক উদ্ধার , এজাহারে আসামি ও গাড়ির তথ্য বদল নিয়ে ধোঁয়াশা
হোম পেজসম্পাদকীয়রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে আশার আলো কেরু

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে আশার আলো কেরু




রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানেই লোকসান, অদক্ষতা আর অপচয়—দেশের মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর সরকারি চিনিকলগুলো লোকসানের বোঝা টানছে, কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের রেকর্ড মুনাফা তাই নিছক একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের খবর নয়, এটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া কেরু এবার প্রায় ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা সম্ভাব্য নিট মুনাফার মুখ দেখেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ও ভ্যাট দেওয়ার পরও এই মুনাফা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সাফল্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বছরের পর বছর লোকসানে চলছে। কেরুর আর্থিক হিসাবের দিকে তাকালে সাফল্যের পাশাপাশি একটি বড় বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়। চিনি উৎপাদন ইউনিটে সম্ভাব্য লোকসান হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি ২০ লাখ টাকা। বিপরীতে ডিস্টিলারি ইউনিট একাই প্রায় ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা সম্ভাব্য মুনাফা করেছে। অর্থাৎ একটি ইউনিটের দক্ষতা ও বাজারসফলতা অন্য একটি ইউনিটের বড় লোকসানকে সামলে প্রতিষ্ঠানকে সামগ্রিকভাবে লাভজনক করেছে। এই সাফল্য যেমন আশাব্যঞ্জক, তেমনি একটি সতর্কবার্তাও কেরুর ভবিষ্যৎকে কেবল ডিস্টিলারি বিভাগের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যাবে না। কেরুর সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির জায়গায়। অনিয়ম, চুরি ও অপচয় বন্ধে পদক্ষেপ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সিসিটিভি স্থাপন, সীমানাপ্রাচীরে কাঁটাতার, অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াত বন্ধ এসব পদক্ষেপ শুনতে ছোট মনে হলেও একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব বড়। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অপচয় কমে, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হয় কেরু তার বাস্তব প্রমাণ দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। ডিস্টিলারি ইউনিটে অটোমেশন, স্বয়ংক্রিয় বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ফলে উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে। বর্তমানে কেরুর কারখানাগুলোর বার্ষিক সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ১ কোটি ৩৫ লাখ প্রুফ লিটারে উন্নীত হয়েছে। বাজারের চাহিদা, বিশেষ করে বিদেশি পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার ফলে স্থানীয় পণ্যের বাড়তি সুযোগ—কেরু কর্তৃপক্ষ সেটিও কাজে লাগিয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি বাজার বাস্তবতা বোঝা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে উৎপাদনকে যুক্ত করাও এই সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা। কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠান বলেই একটি কারখানা টিকে থাকবে এই ধারণা এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিষ্ঠানকে টিকতে হলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা, কঠোর জবাবদিহি, বাজার বিশ্লেষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন ব্যয়ের নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। কেরু দেখিয়েছে, নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা গেলে পুরোনো প্রতিষ্ঠানও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এই সাফল্যে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বরং কেরুর সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা চিনি বিভাগকে ঘুরে দাঁড় করানো। আখের উৎপাদন কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পুরোনো প্রযুক্তি ও কম রিকভারি এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে ডিস্টিলারি থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর চাপ থেকেই যাবে। আখচাষিদের ন্যায্য মূল্য দেওয়া, উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার উদ্যোগ দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে কৃষকের সঙ্গে চিনিকলের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবা জরুরি। আখচাষি লাভবান না হলে আখের আবাদ বাড়বে না, আর পর্যাপ্ত ও মানসম্মত আখ না পেলে চিনিকলের উৎপাদনও বাড়বে না। তাই কেরুর চিনি বিভাগের পুনরুদ্ধার শুধু কারখানার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের আয়, স্থানীয় অর্থনীতি এবং একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পের ভবিষ্যৎ। একই সঙ্গে কেরুর বর্তমান সাফল্যের মডেলটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও প্রয়োগ করা প্রয়োজন। কোথায় অপচয় হচ্ছে, কোথায় অনিয়ম হচ্ছে, কোন ইউনিট লাভজনক হতে পারে, কোথায় প্রযুক্তি প্রয়োজন এবং কোন পণ্যের বাজার আছে—এসব প্রশ্নের বাস্তবভিত্তিক উত্তর খুঁজতে হবে। লোকসানকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনিবার্য নিয়তি হিসেবে মেনে নেয়ার দিন শেষ হওয়া উচিত। কেরুর ৮৮ বছরের ইতিহাসে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নিট মুনাফার এই অর্জন তাই উদযাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও উপলক্ষ। রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিজে কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা তৈরি হয় যখন সেখানে দক্ষতার বদলে অদক্ষতা, জবাবদিহির বদলে দায়হীনতা এবং উৎপাদনের বদলে অপচয় জায়গা করে নেয়। কেরু সেই চিত্রের বিপরীতে একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন প্রয়োজন এই সাফল্যকে স্থায়ী করা এবং এর পরিধি বাড়ানো। ডিস্টিলারি ইউনিটের বাজারসাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি চিনি বিভাগকে লাভজনক করার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে এ ক্ষেত্রে কেরুর পাশে থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই শিথিল না হয়। কেরুর রেকর্ড মুনাফা প্রমাণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের ভাগ্যে শুধু লোকসান লেখা নেই। সঠিক ব্যবস্থাপনা, কঠোর শৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং বাজারের চাহিদা বুঝে উৎপাদন পরিচালনা করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানও লাভজনক হতে পারে। এখন কেরুর সাফল্যকে ব্যতিক্রম হিসেবে রেখে দেয়ার পরিবর্তে এটিকে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের সংস্কারের একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজে লাগানোই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ