ভূমিহীন ও হতদরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে সরকারের আশ্রয়ন প্রকল্প। একটি ঘরকে কেন্দ্র করে অসহায় মানুষের জীবনে নতুন স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এসব আবাসন নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের দর্শনা ফুরশেদপুর আবাসনের বর্তমান চিত্র সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রায় ৫০টি বসতঘর নিয়ে গড়ে ওঠা আবাসনের অর্ধেকের বেশি ঘর এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কোথাও চালের টিন নেই, কোথাও দরজা-জানালা খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক ঘর এখন জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি আবাসন প্রকল্প এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পরিত্যক্ত ঘরগুলো শুধু সরকারি সম্পদের ক্ষয়ই ডেকে আনছে না, এগুলোকে ঘিরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব ঘরের আশপাশে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বাড়ে এবং কোথাও কোথাও মাদকের আড্ডা ও কেনাবেচা চলে। অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি কেবল একটি আবাসন প্রকল্পের অব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এটি জননিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশের জন্যও হুমকি। আশ্রয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কেবল ঘর নির্মাণ করে সুবিধাভোগীদের হাতে চাবি তুলে দেয়া নয়। প্রকল্পের ঘরগুলো যাতে দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা যাতে সেখানে বসবাস করেন এবং সরকারি সম্পদ যাতে বেহাত বা ধ্বংস না হয় তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনো সুবিধাভোগী আবাসন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেলে সেই ঘর বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকবে, আর একপর্যায়ে চোর-দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে নষ্ট হবে এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা হতে পারে না। ফুরশেদপুর আবাসনের ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও বাস্তব অবস্থা যাচাই করা। কোন ঘরে প্রকৃত সুবিধাভোগী বসবাস করছেন, কোন ঘর খালি, কেন খালি এবং খালি ঘরগুলো কীভাবে ব্যবহার করা হবে এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। খালি ঘরগুলো মেরামত করে প্রকৃত ভূমিহীন ও অসহায় পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই হবে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ। একই সঙ্গে যেসব ঘর মেরামতযোগ্য, সেগুলোর সংস্কার ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারিও জরুরি। আবাসন প্রকল্পের খালি ঘরগুলো থেকে টিন, দরজা-জানালা কিংবা অন্য কোনো সরঞ্জাম চুরি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু চুরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকের অভিযোগটিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কোনো পরিত্যক্ত সরকারি স্থাপনা যাতে মাদক কারবারি বা অপরাধীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত না হয়, সে জন্য পুলিশকে নিয়মিত অভিযান ও টহল জোরদার করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আবাসনের বাসিন্দাদেরও মাদক ও অপরাধবিরোধী সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে নিছক একটি স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখবে না। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি আশ্রয়ন প্রকল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা যেমন রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব, তেমনি অসহায় মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষারও দায়িত্ব। যথাযথ নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফুরশেদপুর আবাসন আবারও তার মূল উদ্দেশ্যে ফিরুক ভূমিহীন ও হতদরিদ্র মানুষের নিরাপদ, স্বস্তির এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে।


