নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ এখন নির্ধারিত ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ। মাত্র ২২টি শয্যার বিপরীতে গত ১২ দিনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫৫৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে একসঙ্গে চিকিৎসাধীন রয়েছে শতাধিক শিশু। শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক শিশুকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ আগস্ট থেকে ৩০ আগস্ট রাত ৯টা পর্যন্ত ১২ দিনে শিশু ওয়ার্ডে ৫৫৬ শিশু ভর্তি হয়েছে। অথচ এই ওয়ার্ডে দুটি কেবিনসহ মোট শয্যা রয়েছে মাত্র ২২টি। এর মধ্যে সাধারণ শয্যা ২০টি এবং কেবিন দুটি। প্রতিদিনই নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শিশু চিকিৎসার জন্য আসায় শয্যা খালি হওয়ার অপেক্ষা না করেই নতুন রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে। এতে ওয়ার্ডের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র স্থানসংকট।
সরেজমিনে রবিবার শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত সব কটি শয্যাই রোগীতে পূর্ণ। শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কোথাও বেডের পাশে, আবার কোথাও ওয়ার্ডের ফাঁকা জায়গায় শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন স্বজনেরা। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে ওয়ার্ডজুড়ে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিবেশ। শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকদেরও দীর্ঘ সময় ওয়ার্ডে অবস্থান করতে হচ্ছে। ফলে সীমিত জায়গায় রোগী ও স্বজনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দি-কাশি, ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়েছে। তবে ভর্তি রোগীদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি। শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি বহির্বিভাগেও বেড়েছে রোগীর চাপ। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। মাত্র দুই চিকিৎসককে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন চার মাস বয়সী শিশু জাবের হোসেনের নানী ডলি খাতুন বলেন, তার নাতির নিউমোনিয়া হয়েছে। তিন-চার দিন ধরে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখিয়ে ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হচ্ছিল। বাসায় সেগুলো দেয়ার পরও অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। পরে তাকে হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসাধীন এক মাস বয়সী শিশু রায়হানের বাবা বলেন, তার ছেলের এক সপ্তাহ ধরে ঠান্ডা ও জ্বর ছিল। প্রথমে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেয়া হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে তার সন্তান মোটামুটি ভালো আছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, বর্তমানে অতিরিক্ত গরমের কারণে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ঠান্ডাসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। শিশুরা বেশি ঘামছে এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে নানা ধরনের অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে এ কারণে শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা রয়েছে মাত্র ২২টি। কিন্তু রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই এর তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হচ্ছে। ফলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত রোগীদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসক ও নার্সদেরও অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। জনবলও রোগীর তুলনায় খুবই কম। সীমিত জনবল দিয়ে এত বেশি রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, মাঝেমধ্যে বৃষ্টির কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত গরমে শিশুরা ঘামছে। এ কারণে শিশুদের রোগবালাই বাড়ছে। সদর হাসপাতালে মূলত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুরাই বেশি ভর্তি হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুরাও চিকিৎসা নিতে আসছে। তিনি বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন দুই চিকিৎসক মিলে অন্তত ৩০০ থেকে ৩৫০ শিশু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। রোগীর এই বাড়তি চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্সদেরও অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে।
আবহাওয়ার পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের বাড়তি যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। শিশুকে অতিরিক্ত গরমে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ঘামা শরীর নিয়ে হঠাৎ ঠান্ডা পরিবেশে নেওয়া থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। শিশুর ঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ধুলাবালি ও ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে শিশুর জ্বর, সর্দি-কাশি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুক দেবে যাওয়া, খেতে না চাওয়া বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
শিশুদের পুষ্টির বিষয়েও অভিভাবকদের সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়ে ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, নবজাতক ও ছোট শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে। ছয় মাস বয়সের পর বয়স উপযোগী পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তরল দিতে হবে। শিশুর অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
২২ শয্যার একটি শিশু ওয়ার্ডে ১২ দিনে ৫৫৬ শিশুর ভর্তি এবং প্রতিদিন শত শত শিশুর বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়ার এই চিত্রে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চিকিৎসক ও নার্সদের সীমিত জনবল দিয়ে এই চাপ সামাল দিতে হচ্ছে। ফলে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে শিশুদের জন্য অতিরিক্ত শয্যা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


