দর্শনা অফিস:
দর্শনা ঈশ্বরচন্দ্রপুরের ৬০ বছর বয়সী কোহিনুর খানমের দাবি করেছেন, একটি ঋণের বিপরীতে তার বকেয়া ছিল মাত্র ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা। কিন্তু কিস্তি পরিশোধে কিছুটা বিরতির পর তিন বছরের বেশি সময় পেরিয়ে তার কাছে এখন সুদ, সার্ভিস চার্জ ও অন্যান্য খরচসহ প্রায় দেড় লাখ টাকা পরিশোধের দাবি করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকার একটি চেক ডিজঅনারের মামলাও হয়েছে।
কোহিনুরের অভিযোগ, কিস্তি পরিশোধের পাস বইয়ের হিসাবের সঙ্গে মামলা ও চেকের অঙ্কের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। এ নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটছে তার পরিবারের। তবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আর্স বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন কিস্তি অনাদায়ী থাকা এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণে নিয়ম অনুযায়ী সুদ ও আইনি খরচ যুক্ত হয়েছে। কোহিনুর খানম জানান, ২০২০ সালের ১৬ মার্চ তিনি আর্স বাংলাদেশ নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সদস্য ও ঋণগ্রহীতা হিসেবে ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ভর্তি হন। এর তিন দিন পর, ১৯ মার্চ এক বছরের মেয়াদে তিনি ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করলে সার্ভিস চার্জসহ মোট প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার হিসাব ছিল। এর পরপরই দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। কোহিনুরের দাবি, তখন এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত ছিল। তার পাসবইয়ের সংশ্লিষ্ট কিস্তির ঘরেও ‘করোনা’ লেখা রয়েছে বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে ৫ হাজার, ১০ হাজার এবং সর্বশেষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ করেন বলে জানান কোহিনুর। তার হিসাব অনুযায়ী, মোট ১৪ কিস্তিতে তিনি ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৫০ টাকা পরিশোধ করেছেন। এর সঙ্গে সঞ্চয় হিসেবে ২০ হাজার টাকা এবং ডিপিএস বাবদ ৭ হাজার টাকা জমা রয়েছে বলে তার দাবি। সব মিলিয়ে তার হিসাবে জমা দেয়া অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৯ হাজার ৪৫০ টাকা। সেই হিসাব অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে তার বকেয়া থাকার কথা ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা। কোহিনুরের দাবি, এখানেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা। তার পাসবইয়ে সর্বশেষ কিস্তি পরিশোধের তারিখ ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে আর্স বাংলাদেশের দায়ের করা মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর ১ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকার একটি চেক দেয়া হয় এবং একই দিনে সেটি জনতা ব্যাংক দর্শনা শাখায় জমা দেয়া হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় ২২ অক্টোবর চেকটি ডিজঅনার হয়। একই দিনে ডিজঅনার স্লিপ দেয়া হয়। ২৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে তিনটি লিগ্যাল নোটিশ দেয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও পাঠানো হয় একটি। মামলায় ২৫ নভেম্বর ২০২৩ তারিখকে মামলা দায়েরের কারণ উদ্ভবের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার নথিতে আর্স বাংলাদেশের পাওনা হিসেবে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকার ওই চেকের অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কোহিনুরের দাবি, তার পাসবই ও নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত বকেয়া ছিল ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা। ফলে ঋণগ্রহীতার হিসাব এবং মামলার নথিতে উল্লেখ করা পাওনার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। সেই পার্থক্যের ভিত্তি কীÑএ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান কোহিনুর ও তার পরিবার।
কোহিনুর খানমের পারিবারিক অবস্থাও সচ্ছল নয়। তার স্বামী নাজিমুদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় বলে জানান তিনি। বৃদ্ধ বয়সে কিছু করার আশায় ঋণ নিয়েছিলেন কোহিনুর। কিন্তু ব্যবসা বা কাজ থেকে প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় ঋণ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয় বলে তার দাবি। এখন ঋণের মামলা ও অর্থ পরিশোধের চাপ পরিবারটির দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। কোহিনুর বলেন, যতটুকু প্রকৃত পাওনা, হিসাব করে সেটুকুই দিতে চাই। কিন্তু সামান্য বকেয়া টাকার কারণে এত বড় অঙ্কের দায়ে পড়ে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব?
পরিবারের সদস্যরা জানান, স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার জন্য তারা আর্স বাংলাদেশের দর্শনা শাখা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। সেখানে শাখা ব্যবস্থাপক আমির আলী তাদের জানান, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী শাখা কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে কিছু করার সুযোগ নেই।
কোহিনুরের পরিবারের প্রশ্ন, তার পাসবইয়ে কিস্তি পরিশোধের তথ্য, সঞ্চয় ও ডিপিএসের টাকা এবং করোনা সময়ে কিস্তি স্থগিত থাকার উল্লেখ থাকলে চূড়ান্ত পাওনা নির্ধারণের সময় এসব অর্থ কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের আরও প্রশ্ন, যদি প্রকৃত বকেয়া ১৫ হাজার ৫৫০ টাকা হয়ে থাকে, তাহলে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকার চেকের অঙ্ক কীভাবে নির্ধারণ করা হলো? দীর্ঘ সময়ের সুদ, সার্ভিস চার্জ ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে প্রায় দেড় লাখ টাকার দাবি কীভাবে দাঁড়িয়েছে, তারও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চান তারা।
তবে ঋণগ্রহীতার অভিযোগের বিষয়ে আর্স বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শামসুল আলম বলেন, সংস্থাটির ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে বর্তমানে প্রায় ৪৯ হাজার গ্রাহক বা সদস্য রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ২৪ শতাংশ ‘রিডিউসিং’ বা হ্রাসমান পদ্ধতিতে ঋণ দেয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে প্রতি ১ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে মোট সুদের পরিমাণ আনুমানিক ১২ হাজার ৫০০ টাকা হয়। তিনি বলেন, চুক্তি ভঙ্গ এবং দীর্ঘদিন কিস্তি অনাদায়ী থাকার কারণে ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে সংস্থাটির প্রায় ১ হাজার ৩৮০ জন গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
শামসুল আলমের ভাষ্য, সরকারি ও আইনি নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত সুদ ও আইনি খরচ যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘ সময় মামলা চলায় সংস্থাটিকেও বিপুল আইনি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। কোহিনুরের নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তাকে অফিসে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
একদিকে ঋণগ্রহীতার পাসবইয়ের হিসাব, অন্যদিকে মামলার নথিতে উল্লেখ করা চেকের অঙ্কÑদুইয়ের মধ্যে যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তার কারণ স্পষ্ট হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন কোহিনুরের পরিবারের সদস্যরা। তাদের বক্তব্য, ঋণের প্রকৃত পাওনা থাকলে তা পরিশোধে তাদের আপত্তি নেই। তবে কত টাকা মূল ঋণ, কত টাকা সুদ বা সার্ভিস চার্জ, কত টাকা সঞ্চয় বা ডিপিএস হিসেবে সমন্বয় হয়েছে এবং মামলা ও আইনি খরচ কতÑএসবের বিস্তারিত হিসাব তাদের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হোক।


