ঢাকা অফিস:
সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যক্রমে গতি আনা, সময়ানুবর্তিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পত্র ও নথি নিষ্পত্তিসহ দৈনন্দিন কর্মসম্পাদন নিবিড়ভাবে পরিবীক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন সদস্য বিশিষ্ট কয়েকটি ‘পরিবীক্ষণ টিম’ গঠন করা হবে, যারা পূর্বঘোষণা ছাড়াই আকস্মিক যেকোনো দপ্তর পরিদর্শন করবেন। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা (মূল্যায়ন) শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, দৈবচয়ন ভিত্তিতে এসব টিমকে পরিদর্শনের দায়িত্ব দেয়া হবে। তবে পরিদর্শনের আগে চিঠি দিয়ে সতর্ক করায় ‘আকস্মিক’ অভিযান বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের লিখিত নির্দেশনাটি ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে। গত ২৪ আগস্টের ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ২০৩৪ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নির্ভর করছে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কার্যক্রমের গতি, দক্ষতা ও সময়ানুবর্তিতার ওপর। ফলে দাপ্তরিক কার্যক্রম ত্বরান্বিতকরণ এখন একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। সরকার ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনায় ‘সরকারি কর্মসম্পাদন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি (জিপিএমএস)’ প্রবর্তন করেছে। তবে এর তথ্য বছরে মাত্র দু’বার পর্যালোচিত হয়। ফলে কার্যক্রমের প্রকৃত গতি-প্রকৃতি অনুধাবন ও তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দৈনন্দিন কার্যক্রমের পরিবীক্ষণ-তথ্যও প্রয়োজন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দৈবচয়নে যাচাই হবে পত্র ও নথি নিষ্পত্তি: চিঠিতে বলা হয়েছে, দুই পর্যালোচনার মধ্যবর্তী দীর্ঘ ব্যবধানে অনেক পত্র ও নথি অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিছু মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠিপত্র এবং ফাইলের কাজ শেষ করতে অহেতুক দেরি হচ্ছে। যেহেতু সময়মতো কাজ শেষ করা সুশাসন ও জনপ্রশাসনসংশ্লিষ্ট সেবা উন্নীতকরণের একটি বড় প্রমাণ, তাই এ প্রেক্ষাপটে দৈবচয়ন ভিত্তিতে আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এছাড়া বলা হয়েছে, ‘সচিবালয় নির্দেশমালা ২০২৪’ এবং সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সংগতি রেখে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত পুল থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট কয়েকটি ‘পরিবীক্ষণ টিম’ গঠন করা হবে। দলগুলো পূর্বঘোষণা ব্যতিরেকে যেকোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ পরিদর্শন করবে। ডাক ও ইস্যু রেজিস্টারসহ প্রাসঙ্গিক রেজিস্টার পর্যালোচনা করে দৈবচয়ন ভিত্তিতে পত্রের গন্তব্যস্থল ও নিষ্পত্তির অবস্থা যাচাই করা হবে। এছাড়া ডিজিটাল-নথি বা সফট নথি ব্যবস্থায় নথি উপস্থাপন ও নিষ্পত্তির অবস্থা, অনিষ্পন্ন নথির সংখ্যা এবং বিলম্বিত নিষ্পত্তির হার পরীক্ষা করবে টিম। কার্যাবলি ও কেস নিষ্পত্তির সার্বিক ব্যবস্থাপনা-কর্মবণ্টন, নথির প্রবাহ ও সময়সীমা প্রতিপালনও পর্যালোচনা করা হবে।
জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে দল গঠন ও দায়িত্ব বণ্টন করবে। কর্মসম্পাদনের হার তুলনামূলকভাবে ‘কম কার্যক্ষম’ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিদর্শনের আওতাভুক্ত হবে। পরিদর্শন শেষে পরিবীক্ষণ দল সংযোজনী-‘ক’-এর ছক মোতাবেক পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশসহ প্রতিবেদন পরিদর্শনের দিন অথবা পরবর্তী কার্যদিবসের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দাখিল করবে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য কর্ম সম্পাদনের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিতকরণ, উত্তম চর্চার প্রসার এবং সেবা প্রদানের গতি বৃদ্ধি। এ ছাড়া ডাক ও ইস্যু রেজিস্টারসহ সংশ্লিষ্ট সব রেজিস্টার হালনাগাদ রাখার জন্য বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল-নথি বা হার্ড নথিতে অনিষ্পন্ন নথির নিয়মিত পর্যালোচনা ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। পরিদর্শনের সময় টিমকে প্রয়োজনীয় তথ্য, রেকর্ডপত্রসহ সহযোগিতা প্রদান এবং নির্ধারিত তারিখে পরিদর্শন টিমের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘এগুলো লোকদেখানো পরিদর্শনের মতো। একটি নথি দীর্ঘদিন কেন আটকে আছে, এর পেছনের কারণ কী, এগুলো খুঁজে বের করতে হলে আগে চিঠি দিয়ে চোরকে সতর্ক করার মানে নেই। তারা আসতেন এবং হুটহাট পরিদর্শন করতেন; এটাই নিয়ম।’ তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে এমন অভিযান অনেক হয়েছে। কিন্তু আকস্মিক পরিদর্শনই যদি করবে, তাহলে চিঠি দেওয়ার দরকার নেই তো। এগুলো আসলে লোকদেখানো নির্দেশনা।’
প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, ‘আকস্মিক পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নিয়মিত কাজের বাইরে গিয়ে বাস্তব চিত্র তুলে আনা। কিন্তু পরিদর্শনের আগে যদি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়, তাহলে প্রকৃত অনিয়ম বা বিলম্বের চিত্র অনেকাংশে আড়ালে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে আকস্মিক পরিদর্শনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।’ অবশ্য তিনি বিষয়টিকে একটু অন্যভাবেও দেখছেন, ‘তবে আগাম নির্দেশনা দিয়ে রেজিস্টার হালনাগাদ রাখা বা অনিষ্পন্ন নথি নিষ্পত্তির জন্য সতর্ক করা প্রশাসনিকভাবে অযৌক্তিক নয়। নিয়ম মেনে কাজ করার জন্য এটি একটি প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা হতে পারে। এরপরও যদি দৈবচয়ন ভিত্তিতে পূর্বঘোষণা ছাড়া পরিদর্শন করা হয়, তাহলে সেটি কার্যকর হতে পারে।’ জাহিদ রহমান মনে করেন, পরিদর্শনের উদ্দেশ্য শুধু ত্রুটি ধরা বা কাউকে শাস্তি না দিয়ে কার্যসম্পাদনের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সেবা দেওয়ার গতি বাড়ানো হলে এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে পরিদর্শন অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে হতে হবে।
এ বিষয়ে গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘সরকারের কোনো পরিদর্শন কার্যক্রমের উদ্দেশ্য যদি হয় প্রশাসনের কাজে গতি আনা এবং কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা, তাহলে সেটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে আকস্মিক পরিদর্শনের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে সেটি কতটা কার্যকর ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে তার ওপর।’ তিনি বলেন, ‘একদিকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে রেজিস্টার হালনাগাদসহ নথি নিষ্পত্তির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে আকস্মিক পরিদর্শনের কথাও বলা হচ্ছে। এখানে বিষয় হলো, আগাম সতর্কবার্তার কারণে যেন পরিদর্শনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়। পরিদর্শনকে লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত না করে বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করতে হবে।’ কাজী শরীফ উদ্দিন আরও বলেন, প্রশাসনের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা, গতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিবীক্ষণ প্রয়োজন। তবে এর সঙ্গে সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি যুক্ত করা এবং পরবর্তী সময়ে অগ্রগতি যাচাই করা হলে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ফল দিতে পারে।


