নিজস্ব প্রতিবেদক:
বয়সের ভারে যেখানে মানুষের জীবনের গতি থেমে যাওয়ার কথা, সেখানে জীবন-জীবিকার তাগিদে এখনো সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে চলেছেন আব্দুল বারী। বয়সের সঙ্গে শরীর নুয়ে পড়লেও থামেনি তার পরিশ্রম। কড়াই-সাড়ার কাজ ও ছোটখাটো শ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়ে চাল-ডাল কিনে নিজেই রান্না করে খান। নেই নিজের কোনো জমি, নেই নিরাপদে মাথা গোঁজার ঠাঁই। পরের জমিতে তৈরি একটি ঝুপড়ি ঘরেই একা কাটছে তার দিন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে প্রবীণ আব্দুল বারীর অসহায় জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও। বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় সাংবাদিকদের। সাংবাদিকেরা আব্দুল বারীর জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বিষয়টি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তিথি মিত্রকে জানান। খবর পেয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেন ইউএনও। উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে তিনি নিজেই ছুটে যান আব্দুল বারীর বাড়িতে। এ সময় সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদা ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন। আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তার বসবাসের স্থান ও জীবনযাপনের অবস্থা সরেজমিনে দেখেন ইউএনও তিথি মিত্র। প্রবীণ এই মানুষটির থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা করার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন ইউএনও। তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে আব্দুল বারীর হাতে তুলে দেয়া হয় ১০ কেজি চাল, এক কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের আটটি সামগ্রী। দীর্ঘদিনের কষ্টের জীবনে হঠাৎ প্রশাসনের এই সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
ইউএনও তিথি মিত্র বলেন, আব্দুল বারী নিজের বয়স ১১৫ বছর বলে জানিয়েছেন। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসাবে তার বয়স ১০৫ বছর। এত বয়সেও তিনি এখনো যথেষ্ট সক্ষম ও সচল রয়েছেন। তবে বয়সের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও তার নিজের কোনো জমি নেই। বর্তমানে অন্যের জমিতে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন তিনি। তিথি মিত্র বলেন, আব্দুল বারীর নিজস্ব কোনো জমি নেই। বর্তমানে যে জমিতে তিনি বসবাস করছেন, সেই জমির মালিক লিখিতভাবে সম্মতি দিলে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে সেখানে তার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন ইউএনও।
নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আব্দুল বারী জানান, বিভিন্ন মানুষ তাকে সহযোগিতা করার কথা বললেও বাস্তবে তিনি তেমন সহায়তা পাননি। তবে এলাকার মানুষ মাঝে মধ্যে তাকে সহযোগিতা করেন। তিনি বয়স্ক ভাতাও পান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার বাড়িতে এসে খোঁজ নেয়ায় বেশ খুশি আব্দুল বারী। প্রশাসনের দেয়া খাদ্যসামগ্রী হাতে পেয়ে তার মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ।
স্থানীয়রা জানান, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একাকী নিজের জীবিকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন আব্দুল বারী। বয়সের ভারে যেখানে তার বিশ্রামে থাকার কথা, সেখানে এখনো তাকে সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়ে জীবিকার সন্ধানে ছুটতে হয়। তার এই জীবনসংগ্রাম শুধু দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতাই তুলে ধরে না, সমাজের অসহায় ও প্রবীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।


