দুস্থ ও অসচ্ছল নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। উদ্দেশ্যটি নিঃসন্দেহে মহৎÑপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষ করে তোলা, তাদের আয় করার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং পরিবারে তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু সেই মহৎ উদ্যোগেই যদি অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক অনিয়ম নয় এটি রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থার ওপরও বড় আঘাত। মেহেরপুরের গাংনীতে সরকারি দর্জি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ৩০ জন অসচ্ছল নারীর মাসিক ভাতা ও প্রশিক্ষণের মালামাল কেনার বরাদ্দ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে জুনÑতিন মাসের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া নারীদের এপ্রিল মাসে নির্ধারিত ২ হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া হলেও মে মাসে দেয়া হয়েছে ১ হাজার ৭০০ টাকা। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, জুন মাসের ভাতা দেয়ার কথা বলে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে রেভিনিউ স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া হলেও সরকারি তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের পরও তাদের কোনো টাকা দেয়া হয়নি। অভিযোগকারীদের বক্তব্য সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ সরকারি কোনো প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ করা হয় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য। সেই অর্থের একটি অংশও যদি মাঝপথে অনিয়মের মাধ্যমে আটকে যায় বা আত্মসাৎ করা হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে পড়ে। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রশিক্ষণার্থীদের সিট কাপড়, কাঁচি, সুতা, মেজারমেন্ট টেপ, স্কেলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিজেদের অর্থে কিনে আনতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগও সত্য হলে সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগের সঙ্গে সরকারি অর্থ উত্তোলন ও প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাক্ষর নেয়ার মতো বিষয় জড়িত। ফলে এখানে শুধু মৌখিক অভিযোগ-প্রতিআরোপের মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। ব্যাংক হিসাব, বিল-ভাউচার, ক্যাশবুক, অর্থ উত্তোলনের নথি, রেভিনিউ স্ট্যাম্পে নেওয়া স্বাক্ষর, প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতি ও ভাতা বিতরণের রেজিস্টারÑসবকিছু যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেকের বক্তব্য আলাদাভাবে গ্রহণ করতে হবে। এতে প্রকৃত ঘটনা দ্রুত পরিষ্কার হবে। অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাসিমা খাতুন জুন মাসের সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তার দাবি, ২ আগস্ট নির্দেশনা এসেছে টাকা না দেয়ার জন্য। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের পর এক মাসেরও বেশি সময় অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন হিসাবে রাখা হয়েছিলÑএসব প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা থাকা জরুরি। সরকারি অর্থ ব্যক্তিগত হেফাজতে রাখার বিধি ও প্রক্রিয়াও তদন্তের আওতায় আসা উচিত। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও যথাযথভাবে তদন্তে বিবেচনা করতে হবে, যাতে তদন্ত নিরপেক্ষ ও একপেশে না হয়। এ ক্ষেত্রে গাংনী উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারপ্রাপ্ত ইউএনও নাবিদ হোসেন বিষয়টি দ্রুত খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ও সরকারি প্রকল্পে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। এখন প্রয়োজন সেই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলন। আমরা মনে করি, তদন্ত হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, সরকারি অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগের সত্যতা না মিললে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কারণ তদন্তের লক্ষ্য কাউকে হেয় করা নয়। লক্ষ্য হলো সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা।


