বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজের বহু পুরোনো একটি ব্যাধি। আইন, প্রশাসনিক নজরদারি ও নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচির পরও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের আয়োজনের খবর পাওয়া যায়। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের বদরগঞ্জ-মর্তুজাপুর গ্রামে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রশাসন খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছে বাল্যবিয়েটি বন্ধ করেছে। গত শনিবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ আসিফ হায়দারের নেতৃত্বে প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়ের সব আয়োজন বন্ধ করে দেয়। এমনকি বিয়ের জন্য তৈরি করা গেটও ভেঙে দেয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের বাল্যবিয়ের ক্ষতিকর দিক ও এর আইনগত পরিণতি সম্পর্কে বোঝানো হয় এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বিয়ে না দেয়ার বিষয়ে পরিবারের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়। প্রশাসনের এই দ্রুত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ১৫ বছরের একটি মেয়ের বিয়ের আয়োজন পর্যন্ত কেন গড়াল? একটি কিশোরীর বিয়ের জন্য বাড়িতে গেট তৈরি হলো, প্রস্তুতি চলল অথচ তার আগে পরিবারের কেউ কি একবারও ভাবলেন না যে মেয়েটির বয়স বিয়ের উপযুক্ত হয়নি? স্থানীয় সমাজের কেউ কি বিষয়টি আগেই জানতে পারেননি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ, বাল্যবিয়ে বন্ধের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, পরিবার, সমাজ, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং সচেতন নাগরিকÑসবার। আইন স্পষ্ট। মেয়ের বয়স ১৮ বছর এবং ছেলের বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হলে বিয়ে দেয়া যাবে না। তারপরও নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে অনেক পরিবার অল্প বয়সে মেয়ের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও সামাজিক চাপ, কোথাও নিরাপত্তাহীনতার ভয়, আবার কোথাও প্রচলিত সামাজিক ধারণা এর পেছনে কাজ করে। কিন্তু যে কারণই থাকুক, একটি কিশোরীর শৈশব, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়ার কোনো যুক্তি হতে পারে না। অল্প বয়সে বিয়ে শুধু একটি মেয়ের জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ থামিয়ে দেয় না এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজের ওপরও। বিয়ের পর অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যায়। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে তৈরি হতে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি। মানসিক চাপ, পারিবারিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং স্বাভাবিক বিকাশে বাধার মতো সমস্যাও তাদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। যে বয়সে একটি মেয়ের বই হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে তাকে সংসারের দায়িত্বে ঠেলে দেয়া কোনোভাবেই সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। তাই প্রশাসনের একটি অভিযান দিয়ে একটি বাল্যবিয়ে বন্ধ হওয়াকে সাফল্য হিসেবে দেখেই দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। বরং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কোনো বাড়িতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ের আয়োজন শুরু হলে প্রতিবেশীদের নীরব দর্শক হয়ে থাকা চলবে না। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, সমাজের প্রবীণ ও যুবকদের সক্রিয় হতে হবে। প্রশাসনকে খবর দিতে হবে দ্রুত। কারণ সময়মতো খবর পাওয়া গেলে একটি বিয়ে যেমন বন্ধ করা সম্ভব, তেমনি একটি কিশোরীর ভবিষ্যৎও রক্ষা করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) যথার্থই বলেছেন, বাল্যবিয়ে দেয়া আইনত অপরাধ এবং পুনরায় মেয়েটিকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন সতর্কবার্তা শুধু ওই পরিবার নয়, আশপাশের অন্য পরিবারগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। তবে শাস্তির ভয় দিয়ে বাল্যবিয়ে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা তার প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার আইনগত অধিকার ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা। মেয়েকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। তার শিক্ষা, দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি শিক্ষিত ও আত্মনির্ভর মেয়েই ভবিষ্যতে একটি সচেতন পরিবার ও শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলতে পারে। মর্তুজাপুরে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ তাই প্রশংসনীয়। কিন্তু এমন ঘটনা যেন বারবার ঘটতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। বিয়ের গেট ভেঙে একটি আয়োজন বন্ধ করা যায়, কিন্তু বাল্যবিয়ের মানসিকতা ভাঙতে হলে দরকার পরিবার থেকে পরিবারে সচেতনতা, সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ।


