নিজস্ব প্রতিবেদক:
‘নাও ছাইড়া দেরে মাঝি, পাল উড়াইয়া দে’Ñভাটিয়ালি সুরের এই গানের তালে তালে মাথাভাঙ্গা নদীর বুকে এগিয়ে চলছিল দীর্ঘদেহী বজরা নৌকা। চারপাশে নদীর ঢেউ, দুপাশের সবুজ প্রকৃতি আর নৌকাজুড়ে শিক্ষকদের গান, কবিতা ও আবৃত্তি। শ্রেণিকক্ষের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে এভাবেই এক দিনের জন্য ভিন্ন এক পাঠশালায় পরিণত হয়েছিল মাথাভাঙ্গা নদী। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা পরিবারের উদ্যোগে শতাধিক প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে এ শিক্ষামূলক নৌভ্রমণ। চুয়াডাঙ্গা শহরের পুলিশ পার্ক লেনসংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে নৌকাটি যায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জয়নগর বর্ডার এলাকায়। দিনভর নদীর সৌন্দর্য উপভোগ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সীমান্ত এলাকার দর্শনীয় স্থান ঘুরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবার শহরের ঘাটে ফিরে আসেন তারা। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ পার্ক লেনসংলগ্ন ঘাটে ভেড়ে দুই শতাধিক যাত্রী ধারণক্ষমতার বিশাল বজরা নৌকাটি। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার শতাধিক প্রধান শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান এতে অংশ নেন। নৌকায় ওঠার পরই শুরু হয় সকালের নাশতা। এরপর গানের সুরে নদীর বুকে শুরু হয় যাত্রা।
গানের তালে তালে নৌকা যখন ধীরে ধীরে শহর পেরিয়ে এগোতে থাকে, তখন শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। কেউ গানে কণ্ঠ মেলান, কেউ কবিতা ও ছড়া পাঠ করেন। কেউ আবার উপস্থিত বক্তৃতা ও ব্যক্তিগত পরিবেশনায় মাতিয়ে রাখেন সহযাত্রীদের। নৌভ্রমণের আয়োজনকে প্রাণবন্ত করতে ছিল র্যাফেল ড্র, উপস্থিত বক্তৃতা, বক্তৃতা, কবিতা পাঠ, গান, আবৃত্তি, ছড়া ও নানা ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। নদী ও বাংলার প্রকৃতিকে ঘিরে রচিত গানও পরিবেশন করা হয়। মরমি শিল্পী আব্দুল আলীমের ‘সর্বনাশা পদ্মা নদীরে, তোর কাছে শুধাই’সহ নদীভিত্তিক বিভিন্ন গানে কখনো নৌকার যাত্রীরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন, কখনো আবার হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠে নৌকার পরিবেশ। মাথাভাঙ্গার ঘোলা জলে ঢেউ কেটে নৌকা যত সামনে এগোতে থাকে, ততই বদলে যেতে থাকে চারপাশের দৃশ্য। নদীর দুই পাড়ের সবুজ প্রকৃতি, খোলা আকাশ আর মাঝে মধ্যে নৌকার যাত্রাবিরতিÑসব মিলিয়ে শিক্ষকদের কাছে দিনটি হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী এক অভিজ্ঞতা। পথে চা ও নাশতার বিরতিও ছিল। বিরতির ফাঁকে ফাঁকে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন ভ্রমণপিপাসু শিক্ষকেরা। দুপুরে নৌকাটি দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা এলাকার মেমনগর বিডি বা শতবর্ষী বিপ্রদাস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাথাভাঙ্গা নদীসংলগ্ন এলাকায় যাত্রাবিরতি করে। সেখানে দুপুরের নামাজ আদায় ও মধ্যাহ্নভোজ শেষে আবারও নৌকায় ওঠেন সবাই। এরপর স্যালো ইঞ্জিনচালিত দীর্ঘদেহী বজরা নৌকাটি ঢেউয়ের তালে তালে ঘোলা জলের বুক চিরে এগিয়ে চলে নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে। বিকেল গড়িয়ে যখন নৌকাটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জয়নগর এলাকায় পৌঁছায়, তখন পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়েছে। সীমান্ত এলাকায় নেমে শিক্ষকেরা সেখানকার কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনের আগে তাদের জন্য আয়োজন করা হয় মিষ্টিমুখের। দীর্ঘ নদীপথের ক্লান্তি ভুলে সীমান্ত এলাকার পরিবেশ ও প্রকৃতি উপভোগ করেন তারা। এরপর সন্ধ্যার আগেই আবার নৌকায় ওঠেন সবাই। এবার গন্তব্য চুয়াডাঙ্গা শহরের দিকে। উজান ঠেলে নৌকা যখন মাথাভাঙ্গার বুক দিয়ে ফিরতে শুরু করে, তখন দিনের আলো ধীরে ধীরে নিভে আসে। নদীর দুই পাড়ে কোথাও দূরের বৈদ্যুতিক বাতির ঝলক, কোথাও আবার অন্ধকারের মধ্যে জোনাকির ক্ষীণ আলোÑসব মিলিয়ে নদীর বুকজুড়ে তৈরি হয় অন্য রকম এক মায়াবী পরিবেশ। নৌকার ছন্দময় দোল, পানির ছলছল শব্দ আর সন্ধ্যার আলো-আঁধারি উপভোগ করতে করতে শিক্ষকদের ফেরার পথটিও হয়ে ওঠে দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়ের একটি। এভাবে রাত সাড়ে ৮টার দিকে নৌকাটি আবার পুলিশ পার্ক লেনসংলগ্ন মাথাভাঙ্গা নদীর ঘাটে এসে ভেড়ে। নৌকা থেকে নেমে শিক্ষকেরা যার যার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় ২০২৬ সালের চুয়াডাঙ্গা সদর মাধ্যমিক শিক্ষা পরিবারের শিক্ষামূলক নৌভ্রমণ।
শিক্ষকদের এ ব্যতিক্রমী নৌভ্রমণের সার্বিক আয়োজনে সহযোগিতা করেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মিকাইল হোসেন ও একাডেমিক সুপারভাইজার সোহেল আহমেদ। তাদের সঙ্গে আয়োজনের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন চুয়াডাঙ্গা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূর হোসেন, মালিক আব্দুল বারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন, মুন্সিগঞ্জ সৃজনী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক আহাদ আলী মোল্লা এবং আল হেলাল ইসলামী একাডেমির শিক্ষক আব্দুল হাইসহ সংশ্লিষ্টরা। নৌভ্রমণে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে শিক্ষকদের সফরসঙ্গী ছিলেন চুয়াডাঙ্গা জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফজলুর রহমান এবং চুয়াডাঙ্গা জেলা শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইসলাম রকিব।


