নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনার একটি ছাত্রাবাসে সহিংসতার শিকার হয়ে আজমুল হোসেন (২১) নামে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের এই শিক্ষার্থীকে ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অপবাদ দিয়ে মারধরের পর ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলামনগর রোডের একটি ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এলাকার বড়শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পড়াশোনার জন্য প্রায় এক বছর আগে তিনি খুলনায় যান। সম্প্রতি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার জানিয়েছেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও মেসের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইসলামনগর রোডের চারতলা ভবনটি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল ভবনের ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। মেসের ব্যবস্থাপকের কক্ষে থাকা খাবার আজমুল খেয়ে ফেলেছিলেনÑএমন অভিযোগ তুলে শুক্রবার রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। অভিযোগ রয়েছে, মেসের ব্যবস্থাপক মেহেদীসহ কয়েকজন ছাত্র এবং কয়েকজন বহিরাগত আজমুলকে ভবনের ছাদে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে আশপাশের বাসিন্দারা ওপর থেকে কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পান। পরে গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মেসের অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজমুলের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তার দুই পা ভাঙা ছিল। তবে আজমুলকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল, নাকি মারধরের একপর্যায়ে তিনি নিচে পড়ে যানÑএ বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন জানান, শুক্রবার রাত ৯টার দিকে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন আজমুল তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি ভালো আছেন এবং চিন্তা না করতে। কুতুব উদ্দিনের ভাষ্য, রাত ১২টার পর ছেলের মুঠোফোন থেকে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করেন। ওই ব্যক্তি আজমুলকে ‘ঝামেলা করেছে’ জানিয়ে তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে খুলনায় আসতে বলেন। কুতুব উদ্দিন নিজেকে কৃষক পরিচয় দিয়ে এত টাকা তার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয় বলে জানান। এরপর তিনি ট্রেনে করে খুলনায় আসার কথা বলেন। কুতুব উদ্দিন বলেন, সকালে খুলনায় এসে তিনি জানতে পারেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই। ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়া এই বাবা বলেন, তিনি একজন দরিদ্র কৃষক। ছেলের মৃত্যুর বিচার কার কাছে চাইবেন, তা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
মেসের বুয়া ফাতেমার ভাষ্য, আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগে টাকা ও পোশাক চুরির অভিযোগ উঠেছিল। তবে শুক্রবার রাতে খাবার চুরির অভিযোগে তাকে মারধর করা হলে তিনি বাধা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার কথায়, অভিযুক্তরা তার নিষেধ শোনেননি। এদিকে পাশের ভবনের এক নারী বাসিন্দা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে একটার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনেছিলেন। দরজা খুলে বাইরে এসে গলিতে একজন তরুণকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মেসের কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
এ ঘটনায় আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন শনিবার রাতে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। হরিণটানা থানার অফিসার ইনচার্জ ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। নিহতের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করার কথাও আগে জানিয়েছিল।
খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এ ঘটনায় আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঘটনার পর অভিযুক্তদের কয়েকজন আত্মগোপনে রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, আজমুল ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য ছিল না। আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং তাদের আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই ঘটনাস্থলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি এখতিয়ার নেই। তবে ঘটনা জানার পর থেকে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গার বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক কুতুব উদ্দিনের সন্তান আজমুলের এমন মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোক নেমে এসেছে। পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়ে খুলনায় যাওয়া তরুণটির জীবন থেমে গেল মাত্র কয়েক দিনের বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই। এখন তার পরিবারের একটাই দাবিÑঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন হোক এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হোক।


