চুয়াডাঙ্গা শহরের ফুটপাত ও সড়কের পাশ দখলমুক্ত রাখা জরুরি এ নিয়ে দ্বিমতের সুযোগ নেই। পথচারীর চলাচল নির্বিঘ্ন করা, যানজট কমানো এবং শহরের সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে যদি বছরের পর বছর ফুটপাত ও সড়কের পাশে ছোট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলোর সামনে জীবিকার সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়, তাহলে নগর ব্যবস্থাপনার সেই উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়বেই। চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসককে প্রত্যাহার, ফুটপাতে তারকাঁটা দেয়া বন্ধ এবং উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের দাবিতে ‘পৌর নাগরিক সমাজ’র ব্যানারে যে বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর ভেতরে রয়েছে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ফুটপাতের ছোট দোকান, ভ্যান, ঠেলাগাড়ি কিংবা অস্থায়ী পসরা এসবের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। তাদের অনেকেরই অন্য কোনো আয় নেই। দিনের শেষে সামান্য লাভে সংসার চালান, সন্তানের পড়াশোনা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটান। হঠাৎ উচ্ছেদ হয়ে গেলে তাদের কাছে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় না। ফলে একটি দোকান উচ্ছেদ মানে অনেক সময় একটি পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। অবশ্যই ফুটপাত পথচারীদের জন্য। সড়কের পাশে অবৈধভাবে ব্যবসা বসিয়ে যান চলাচল ব্যাহত করা বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করাও গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নাগরিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে উচ্ছেদের আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রশাসন চাইলে শহরের উপযুক্ত কোনো এলাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করতে পারে। সেখানে পরিচয় ও ব্যবসার ধরন অনুযায়ী জায়গা বরাদ্দ, নির্দিষ্ট ভাড়া, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে একদিকে ফুটপাত ও সড়ক থাকবে দখলমুক্ত, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকাও রক্ষা পাবে। নগর ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাধান, যেখানে পথচারী, যানবাহন, ব্যবসায়ী ও পৌর কর্তৃপক্ষ সব পক্ষই ন্যায্য সুবিধা পায়। ফুটপাতে তারকাঁটা দিয়ে মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এটি হয়তো সাময়িকভাবে দখল ঠেকাবে, কিন্তু মানুষের জীবিকার প্রশ্নের উত্তর দেবে না। বরং এমন পদক্ষেপ ক্ষোভ ও সামাজিক অসন্তোষ বাড়াতে পারে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সেই ক্ষোভকে দমন করা নয়, বরং তার কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করা। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নির্ধারিত স্থানে ব্যবসা করা, পথচারী ও যান চলাচলে বাধা না দেয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পৌরসভার নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে তাদেরও অঙ্গীকার থাকা প্রয়োজন। পুনর্বাসনের সুযোগ দিলে সেই সুযোগের অপব্যবহার যাতে না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি জরুরি। চুয়াডাঙ্গা পৌর কর্তৃপক্ষের উচিত বিক্ষোভকারীদের দাবিকে বিরোধিতার চোখে না দেখে আলোচনার টেবিলে বসা। উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাদের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন পরিকল্পনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত চুয়াডাঙ্গা যেমন প্রয়োজন, তেমনি দরকার এমন একটি মানবিক শহর যেখানে উন্নয়ন হবে মানুষের জন্য, মানুষের জীবন-জীবিকাকে উপেক্ষা করে নয়। তাই সমাধান হওয়া উচিত ‘উচ্ছেদ বনাম ব্যবসায়ী’ এই দ্বন্দ্বে নয়; বরং ‘শৃঙ্খলা ও জীবিকার সমন্বয়’র পথে। চুয়াডাঙ্গা শহরের ফুটপাত দখলমুক্ত হোক, সড়কে স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত হোক। কিন্তু সেই সঙ্গে যাদের জীবিকা উচ্ছেদ হয়েছে, তাদের জন্যও খুলে দেয়া হোক নতুন জীবিকার দরজা। প্রশাসনের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কঠোরতার সঙ্গে মানবিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা।


