নিজস্ব প্রতিবেদক:
দর্শনা থেকে ভোলার ঘোষঘাটে কাজী ফার্মস লিমিটেডের নির্ধারিত ইউনিটে পাঠানো প্রায় ৯ লাখ টাকা মূল্যের ২১ হাজার ৬৯০ কেজি ভুট্টাবোঝাই একটি ট্রাক উধাও হওয়ার ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। নির্ধারিত গন্তব্যে মালামাল না পৌঁছে মাঝপথে ট্রাকসহ ভুট্টা গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে ট্রাক উদ্ধার হলেও ঘটনার মূল রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। এ ঘটনায় কাজী ফার্মস লিমিটেডের দর্শনা এলাকার শস্য ক্রয় প্রতিনিধি ইকবাল কবির জাহিদ দর্শনা থানায় লিখিত এজাহার দিয়েছেন। এজাহারে ট্রাকের চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে প্রায় ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ, ট্রাক উদ্ধারের স্থান, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং অভিযোগের বিভিন্ন কপিতে আসামি ও গাড়ির তথ্য পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ফলে এটি কেবল চালকের প্রতারণা, নাকি এর পেছনে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছেÑতা নিয়ে ধোঁয়াশা আরও বেড়েছে।
দর্শনা থানায় দেয়া এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১২ আগস্ট থেকে পর্যায়ক্রমে ভোলার ঘোষঘাটে কাজী ফার্মস লিমিটেডের ইউনিটে ভুট্টা পাঠানো হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ সেপ্টেম্বর দর্শনার সি অ্যান্ড এফ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি ট্রাক ভাড়া করা হয়। যশোর-ট-১১-৩৫৩৪ নম্বরের ওই ট্রাকে ২১ হাজার ৬৯০ কেজি ভুট্টা বোঝাই করা হয়। এ ভুট্টার বাজারমূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাকটির চালক ছিলেন পরকৃষ্ণপুর গ্রামের আশরাফ হোসেনের ছেলে মহিবুল ইসলাম (৩২)। হেলপার হিসেবে ছিলেন একই গ্রামের আলফাজ হোসেনের ছেলে আল-আমিন হোসেন ওরফে পিয়াস (২৫)। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর রাতে ট্রাকটির ভোলার উদ্দেশে রওনা দেয়ার কথা থাকলেও চালক দুই দিন ধরে ট্রাকটি রামনগর মোড়ে রেখে দেন। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর সকালে হেলপারকে রেখে চালক একাই ট্রাক নিয়ে ভোলার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ভুট্টা ভোলার ঘোষঘাটে পৌঁছায়নি। এর মধ্যে চালক মহিবুল ইসলামের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। এতে মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। ঘটনাটি নতুন মোড় নেয় ১৭ সেপ্টেম্বর। অভিযোগকারী ইকবাল কবির জাহিদ চালকের খোঁজে ট্রাকমালিক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন ট্রাকমালিকের ম্যানেজারের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, চালক মহিবুল ইসলাম ১৪ সেপ্টেম্বরই তাদের কাছে ফিরে এসে গাড়িভাড়ার হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেছেন।
অভিযোগকারীর দাবি, ১৩ সেপ্টেম্বর দর্শনা থেকে রওনা হয়ে পরদিন ১৪ সেপ্টেম্বর ভোলায় গিয়ে মালামাল নামিয়ে আবার দর্শনায় ফিরে এসে গাড়ির হিসাব বুঝিয়ে দেয়া বাস্তবসম্মত নয়। তার অভিযোগ, এ ঘটনাই মালামাল গন্তব্যে না পৌঁছানোর বিষয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, চালক ও তার সহযোগীরা অসৎ উদ্দেশ্যে ভুট্টা গন্তব্যে না নিয়ে পথিমধ্যে তা বিক্রি বা আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। ভুট্টার মূল্য ৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং অগ্রিম গাড়িভাড়া ৩২ হাজার টাকাসহ মোট ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঘটনার পর পুলিশ ও কোম্পানির প্রতিনিধিরা অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে তথ্য পাওয়া যায়, ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি ভোলার দিকে না গিয়ে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানা এলাকার একটি নির্জন স্থানে রাখা হয়েছে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আলমডাঙ্গা এলাকা থেকে ট্রাকটি উদ্ধার করে। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চালক ও তার সহযোগীরা সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ট্রাকের ভেতরে থাকা ভুট্টা উদ্ধার হওয়ায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মালামাল ফিরে পাওয়া গেলেও ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কেন ট্রাকটি আলমডাঙ্গায় রাখা হয়েছিলÑএসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে অভিযোগের বিভিন্ন কপিতে থাকা তথ্যের পার্থক্য। সংশ্লিষ্টদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক খসড়া অভিযোগে আলমডাঙ্গাকেন্দ্রিক অন্য আসামি এবং ভিন্ন একটি গাড়ির নম্বরের কথা উল্লেখ ছিল। পরে চূড়ান্ত এজাহারে চালক মহিবুল ইসলাম ও হেলপার আল-আমিন হোসেন ওরফে পিয়াসকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর নাম, আসামিদের পরিচয় এবং গাড়ির নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের এই পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি ট্রাক উদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ কী, প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে চূড়ান্ত এজাহারের পার্থক্য কেন হলো এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি নাÑএসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ট্রাকমালিকপক্ষের দাবি, চালকের কাছ থেকে হিসাব বুঝে পাওয়ার পর তারা ট্রাকটি অন্য চালক দিয়ে নতুন ট্রিপে পাঠান। পরে ভুট্টা নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়নি জানতে পেরে তারা অভিযুক্ত চালক মহিবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু এরপর থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ট্রাকমালিকপক্ষ কীভাবে চালকের কাছ থেকে হিসাব বুঝে নিল, সেই হিসাবের ভিত্তি কী ছিল এবং পরে ট্রাকটি কীভাবে নতুন ট্রিপে গেলÑএসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
দর্শনা থানার অফিসার ইনচার্জ নজরুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইকবাল কবির জাহিদের পক্ষ থেকে লিখিত এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের তৎপরতায় উধাও হওয়া ভুট্টাবোঝাই ট্রাকটি আলমডাঙ্গা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং আত্মসাতের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত পলাতক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাক ও ভুট্টা উদ্ধার হলেও এজাহারের তথ্যের পরিবর্তন, চালকের কথিত গতিবিধি এবং মালামাল গন্তব্যে না পৌঁছানোর বিষয়টি ঘিরে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তদন্তে তার উত্তর মিলবে কি নাÑএখন সেটিই দেখার বিষয়। বিশেষ করে মূল অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়ে তাদের বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার পুরো চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না।


