আলমডাঙ্গা অফিস:
বিরিয়ানি খাওয়ার পর একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শিশুসহ একই এলাকার ২৬ জন। তাদের প্রায় সবাই বমি, ডায়রিয়া ও তীব্র পেটব্যথায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আলমডাঙ্গা শহরের থানা রোডের ‘হাজী বিরিয়ানি হাউজ’ থেকে বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে খাওয়ার পরই তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
গত সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে আলাদা সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যান ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরিয়ানি খাওয়ার পর রাত থেকেই একে একে বমি, ডায়রিয়া ও তীব্র পেটব্যথা শুরু হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল ও আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে ওই ঘটনায় আক্রান্ত আরও ছয়জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ নিয়ে একই প্রতিষ্ঠানের খাবার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন আলমডাঙ্গা উপজেলার নাগদাহ ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামের ফারুকের স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (২৭) এবং তাদের দুই সন্তান তাওহিদ (২) ও তাওসিফ (৮)। রয়েছেন জেহালা ইউনিয়নের রোয়াকুলি গ্রামের জিনারুল ইসলাম (৪৬), তার স্ত্রী পান্না খাতুন (৪২) ও ছেলে সাহেদ (১৩)। এছাড়া চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের জাহিদ হোসেনের স্ত্রী (৩৫), তার মেয়ে জান্নাতুল শ্রাবণী (১৫) এবং তাদের আত্মীয় জিহাদ আলীর স্ত্রী সুবর্ণা খাতুন (২১) অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আলমডাঙ্গার নাগদাহ ইউনিয়নের চিলাভালকী গ্রামের মাঝেরপাড়ার লিখনের স্ত্রী সোনিয়া খাতুন (২২), একই এলাকার দেলোয়ারের স্ত্রী সাবিনা খাতুন (৩২) ও তার দুই ছেলে জনি (১১) ও রনি (১৫) এবং চিৎলা ইউনিয়নের হাপানিয়া গ্রামের ইউনুচ আলীর স্ত্রী শিরিনা খাতুন (৪০) ও লিখনের মেয়ে নুসরাত জাহান (১৬) হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অপরদিকে, ভাংবাড়ীয়া ইউনিয়নের গৌরীহ্রদ গ্রামের আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী পারুলা বেগম (৪২), খাসকররা গ্রামের আলী আজগরের স্ত্রী পরিছন নেছা (৪৫), জাহিদুল ইসলামের দুই ছেলে জিহান (৫) ও জায়ান (১৩ মাস) এবং আসাদুল হকের মেয়ে আইভি খাতুন (২৩) অসুস্থ হয়েছেন।
ভুক্তভোগী ফারুক হোসেন বলেন, অফিস শেষে তিনি হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে বিরিয়ানি কিনে বাসায় নিয়ে যান। রাতে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান সেই বিরিয়ানি খান। রাত ১২টার পর থেকেই তারা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরু হয় বমি, পেটব্যথা ও ডায়রিয়া। পরদিন সকালে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফারুক বলেন, পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে বাড়িতে রান্না করার মতোও কেউ নেই। তার ধারণা, খাবারে কোনো সমস্যা ছিল। কারণ, পরিবারের যারা বিরিয়ানি খেয়েছেন, তারাই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। বিষয়টি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের খতিয়ে দেখা উচিত।
আরেক ভুক্তভোগী জাহিদ হোসেন বলেন, আলমডাঙ্গায় ঘুরতে গিয়ে ফেরার সময় হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে বাসায় ফেরেন। পরিবারের তিনজন মিলে ওই বিরিয়ানি খাওয়ার পর থেকেই সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তীব্র পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া শুরু হলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জাহিদ বলেন, একই বিরিয়ানি খেয়ে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে একাধিক রোগী ভর্তি হয়েছেন। দু-একজন অসুস্থ হলে অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। কিন্তু একাধিক মানুষ একইভাবে অসুস্থ হওয়ায় বিরিয়ানিতে কোনো সমস্যা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি এক শিশুর মা বলেন, সোমবার রাতে হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে আনা বিরিয়ানি খাওয়ার পরদিন সকাল থেকেই তার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শুরু হয় তীব্র পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া। পরে তাকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি বলেন, বমি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সদর হাসপাতালে অনেক রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরিয়ানি খাওয়ার পর তারা অসুস্থ হয়েছেন। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন।
চুয়াডাঙ্গার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা রিয়াজ মাহমুদ বলেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ঘটনার দিনকার খাবারের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। নমুনা পাওয়া গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অসুস্থতার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেত।
একই প্রতিষ্ঠানের খাবার খেয়ে একাধিক পরিবারের ২৬ জন অসুস্থ হওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি হাজী বিরিয়ানি হাউজের ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির একটি ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। তবে খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্যান্য অনুমোদন বা সনদ রয়েছে কী-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় তিন বছর ধরে আলমডাঙ্গা শহরের ব্যস্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করে আসছে।
এ বিষয়ে হাজী বিরিয়ানি হাউজের মালিক মিজানুর রহমান বলেন, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে, তিনি বুঝতে পারছেন না। কেউ ইচ্ছা করে এত মানুষের জন্য খারাপ খাবার তৈরি করবেন কী-না, সেটিও তার বোধগম্য নয়। ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স করা হয়েছে। বাকি প্রয়োজনীয় লাইসেন্সও দ্রুত করা হবে।
ঘটনার খবর পেয়ে মঙ্গলবার বিকেলে হাজী বিরিয়ানি হাউজে অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছেন আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এস এম শাহনেওয়াজ মেহেদী। তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর তারা প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে খাবারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় লাইসেন্স করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তবে একই খাবার খেয়ে ধারাবাহিকভাবে এত মানুষের অসুস্থ হওয়ার অভিযোগের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। খাবারে কোনো ধরনের দূষণ বা বিষক্রিয়া ছিল কি না, রান্না ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়েছিল কি নাÑএসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও যথাযথ তদন্ত। একই সঙ্গে একটি খাদ্যপ্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করেছে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, খাবারের মান পরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।


