খাবার মানুষের জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান। সেই খাবারই যদি অসুস্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিষয়টি কেবল একটি পরিবারের দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ব্যবসায়িক দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। আলমডাঙ্গায় একটি বিরিয়ানি হাউজের খাবার খেয়ে শিশুসহ তিন পরিবারের নয়জন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অভিযোগ তাই কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাটি উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে আলমডাঙ্গা থানা-সংলগ্ন হাজী বিরিয়ানি হাউজ থেকে বিরিয়ানি কিনে বাড়িতে নিয়ে যান তারা। রাতে সেই খাবার খাওয়ার পর একে একে পরিবারের সদস্যদের তীব্র পেটব্যথা, বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরদিন তাদের চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিশুসহ নয়জন একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন এবং তাদের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরিয়ানি খাওয়ার পরই তারা অসুস্থ হয়েছেন। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑখাবার খাওয়ার পর অসুস্থতার অভিযোগ উঠেছে, কিন্তু খাবারই যে অসুস্থতার কারণ, তা এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগেভাগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না। তবে একই খাবার খাওয়ার পর একাধিক মানুষের একই ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়ার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুতর। বিষয়টি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিকভাবে তদন্ত করা জরুরি। খাদ্যে বিষক্রিয়া বা দূষিত খাবারের কারণে অসুস্থতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিটি এমন ঘটনার পর যদি কেবল রোগীদের চিকিৎসা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়, তাহলে সমস্যার মূল জায়গাটি অমীমাংসিত থেকে যায়। খাবার প্রস্তুতের পরিবেশ কেমন ছিল, কাঁচামালের মান ঠিক ছিল কি না, রান্না ও সংরক্ষণে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়েছিল কি না, খাবার কতক্ষণ সংরক্ষণ করা হয়েছিল এবং পরিবেশনের আগে যথাযথ তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়েছিল কি নাÑএসব প্রশ্নের উত্তর বের করা দরকার। বিশেষ করে বিরিয়ানি, মাংস, ডিম, দুধ ও অন্যান্য দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো খাবারের ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, অপর্যাপ্ত তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ, বাসি খাবার পুনরায় পরিবেশন, অপরিষ্কার পানি কিংবা কাঁচা ও রান্না করা খাবার একই জায়গায় রাখার মতো অনিয়ম থেকে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই শুধু খাবারের স্বাদ বা পরিবেশনের চাকচিক্য নয়, খাবার নিরাপদ কি নাÑএটিই হওয়া উচিত ভোক্তার প্রধান বিবেচনা।
এ ঘটনায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলেছে, অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। আমাদের প্রত্যাশা, অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। খাবারের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা, রান্নাঘর ও সংরক্ষণব্যবস্থা পরিদর্শন করা এবং প্রতিষ্ঠানের খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত অনুমোদন ও নিয়মকানুন যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দায় প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের প্রতিও বার্তা স্পষ্ট হওয়া দরকারÑখাবারের ব্যবসা শুধু লাভের ব্যবসা নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি দায়িত্বশীল পেশা। একজন ব্যবসায়ী হয়তো একটি প্যাকেট খাবার বিক্রি করছেন, কিন্তু সেই খাবার একটি শিশুর হাতে পৌঁছাচ্ছে, কোনো গর্ভবতী নারী কিংবা বয়স্ক মানুষের পেটে যাচ্ছেÑএই বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। কয়েক টাকা বেশি লাভের জন্য মানহীন উপকরণ ব্যবহার কিংবা স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। সন্দেহজনক গন্ধ, স্বাদ, রং বা পরিবেশনে অসঙ্গতি থাকলে খাবার না খাওয়া, বিল বা ক্রয়ের প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি। এতে একদিকে নিজের অধিকার রক্ষা হবে, অন্যদিকে একই ধরনের ক্ষতির শিকার হওয়া থেকে অন্য ভোক্তারাও রক্ষা পেতে পারেন। আলমডাঙ্গার এই ঘটনায় সবচেয়ে জরুরি হলোÑকারও বিরুদ্ধে অযথা অভিযোগ নয়, আবার অভিযোগটিকে উপেক্ষাও নয়। সত্য উদ্ঘাটনে দ্রুত তদন্ত চাই। খাবার দূষিত হলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগের সত্যতা না থাকলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনুমান নয়, প্রয়োজন প্রমাণ ও জবাবদিহি।


