নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা শহরের ওভারপাসের নিচের লেভেল ক্রসিং রেলগেটের একটি ব্যারিয়ার যান্ত্রিক ত্রুটিতে অকেজো হয়ে পড়ায় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন এ পথে চলাচলকারী পথচারী ও যানবাহনের চালকেরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে গেটের একটি বার (ব্যারিয়ার) পুরোপুরি অচল হয়ে আছে। ফলে ট্রেন আসার সময় গেটের এক পাশ বন্ধ হলেও অন্য পাশ খোলা থাকছে। এতে ব্যস্ততম এই সড়কে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে একটি মালবাহী ট্রেন চুয়াডাঙ্গা শহরের ওই লেভেল ক্রসিং অতিক্রম করার সময় সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা যায়। ট্রেন আসার আগে এক পাশের ব্যারিয়ার নিচে নামলেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শহরের দিকের ব্যারিয়ারটি নামেনি। ফলে রেললাইনের দুই পাশে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় গেটম্যান শিহাবকে দুই হাত প্রসারিত করে এবং হাতে লাল পতাকা উঁচিয়ে যানবাহন থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিন্তু ব্যস্ত সড়কে অনেক চালক সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন নিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে পারাপার হচ্ছিলেন। একটি মুহূর্তের অসতর্কতাই সেখানে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারত।
গেটম্যান শিহাব বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই রেলগেটের একটি ব্যারিয়ার কাজ করছে না। বিষয়টি জানার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের—আইডব্লিউ (ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। শিহাব বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই গেটটি কাজ করছে না। আমি সঙ্গে সঙ্গেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে আমাকে একাই লাল পতাকা হাতে সারা রাত এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তার ভাষ্য, একটি ব্যারিয়ার অচল থাকায় ট্রেন আসার সময় দুই পাশের যানবাহন একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে গেটম্যান হিসেবে তাকে বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
রেলগেটের ত্রুটির বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গেটম্যান রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। তবে রেলগেটের যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মূল দায়িত্ব আইডব্লিউ বিভাগের। মিজানুর রহমান বলেন, গেটম্যান আমার রেলওয়ে ট্রাফিক বিভাগের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু রেলগেটের যেকোনো যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত বা দেখভালের মূল দায়িত্ব হচ্ছে আইডব্লিউ বিভাগের। আমরা যথাসময়ে আইডব্লিউ বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করেছি। স্টেশন মাস্টার আরও জানান, আইডব্লিউ বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ত্রুটিটি মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। শুক্রবার দিনের বেলায় রেলগেটটি মেরামতের কথা রয়েছে। তবে আইডব্লিউ বিভাগের চুয়াডাঙ্গার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চুয়াডাঙ্গা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। ওভারপাসের নিচের এই রেলগেটটি শহরের বিভিন্ন অংশের মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় সামান্য ত্রুটিও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি ব্যারিয়ার অকেজো থাকার পরও দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ না নেয়া রেলওয়ের দায়িত্বশীলতার ঘাটতিরই বহিঃপ্রকাশ। ট্রেন চলাচলের সময় গেটের এক পাশ খোলা থাকলে চালকেরা ভুল করে কিংবা অসতর্কতাবশত রেললাইনে উঠে যেতে পারেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারা দ্রুত ত্রুটি মেরামতের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রেলগেটের যান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে রেলগেট এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা ও যানবাহনচালক গেটম্যান শিহাবের দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়েও অভিযোগ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন, ট্রেন আসার অনেক আগেই শিহাব রেলগেটের ব্যারিয়ার নামিয়ে দেন। এতে দীর্ঘ সময় যানবাহন নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এ নিয়ে অনেক সময় চালকদের সঙ্গে গেটম্যানের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এছাড়া বৃহস্পতিবার ব্যারিয়ারের যে তার ছিঁড়ে গেছে, সেটিও গেটম্যানের অদূরদর্শিতার কারণে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে গেটম্যান শিহাব বলেন, ব্যারিয়ারের তার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই ছিঁড়ে গেছে। এ কারণেই একটি ব্যারিয়ার আর কাজ করছে না।
রেলগেটের একটি ব্যারিয়ার অচল থাকায় বর্তমানে গেটম্যানকে লাল পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। কিন্তু ব্যস্ত সড়কে শুধু একজন কর্মীর সতর্কতা দিয়ে একটি রেলগেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, রাতের বেলায় কিংবা কুয়াশা, বৃষ্টি অথবা অতিরিক্ত যানজটের মধ্যে এমন ত্রুটি আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই শুক্রবার দিনের বেলায় মেরামতের যে আশ্বাস দেয়া হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা। চুয়াডাঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ এই লেভেল ক্রসিংয়ে রেল ও সড়ক দুই ধরনের যান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সাময়িকভাবে ব্যারিয়ার সচল করাই নয়, পুরো ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকি জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
২২


