নিজস্ব প্রতিবেদক:
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের আদেশ পেয়ে যোগদান করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন এসএম গ্রেড-৩ মামুনুর রশিদ। তার অভিযোগ, স্টেশনে প্রবেশের সময় দর্শনা যুবদলের বহিষ্কৃত এক নেতাসহ ১০ থেকে ১৫ জন তাকে ঘিরে ধরেন। একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি করে তাকে একটি ভ্যানে তুলে স্টেশন এলাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এ সময় তাকে গালিগালাজ ও হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বহিস্কৃত ওই নেতা ও দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার নাজমা খাতুন। তাদের দাবি, মামুনুর রশিদের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেনি। আর নাজমা খাতুন বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি স্টেশনে ছিলেনই না এবং তাকে লোকজন দিয়ে বাধা দেয়ার অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মামুনুর রশিদকে দর্শনা স্টেশনে যোগদানে বাধা দেয়ার বিষয়টি তারা জানতে পেরেছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি রেল মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। অনলাইনে তার যোগদান সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্রুত তাকে স্টেশনে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গত ২৫ আগস্ট জারি করা আদেশে অপারেশনাল মামুনুর রশিদকে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়। আদেশে তাকে দর্শনা এসএমআর’র কাজ দেখভালের দায়িত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদেশটি ‘অনতিবিলম্বে কার্যকর’ করার নির্দেশও দেয়া হয়।
মামুনুর রশিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আদেশ পাওয়ার পর ২৬ আগস্ট সকালে তিনি দায়িত্ব বুঝে নিতে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে যান। স্টেশনে প্রবেশের সময় ১০ থেকে ১৫ জন তরুণ তাকে বাধা দেন। মামুনুর রশিদ বলেন, তাকে যোগদান না করার জন্য চাপ দেয়া হয়। দ্রুত স্টেশন এলাকা ছেড়ে না গেলে ক্ষতি হতে পারে এমন হুমকিও দেয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে ধাক্কাধাক্কি করে একটি ভ্যানে তুলে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ওরা আমাকে ধাক্কাধাক্কি করে একটি ভ্যানে তুলে দেয়। দর্শনা স্টেশনে যেন আর না আসি এবং কোনোভাবেই যেন যোগদান না করি এমন কথা বলে আমাকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। মামুনুর রশিদের দাবি, দর্শনা স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার নাজমা খাতুন ও সহকারী স্টেশন মাস্টার আশিকুর রহমানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই তাকে যোগদানে বাধা দেয়ার জন্য লোকজন ‘ম্যানেজ’ করেছেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে বাধা দেয়া ব্যক্তিদের কাউকেই তিনি আগে থেকে চিনতেন না বলে জানান। মামুনুর রশিদ জানান, ঘটনার পর বিষয়টি রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন তিনি। পরে তাকে স্টেশনে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। এর মধ্যে বুধবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে আরেক পক্ষ তাকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে যোগদান করানোর চেষ্টা করেন। এ সময় দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় চিল্লাচিল্লি ও বিশৃঙ্খলা। পরিস্থিতি ঘিরে সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে একধরনের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। মামুনুর রশিদের আরও অভিযোগ, পরে পরিচিত একজনের কাছে আশ্রয় নিলে সাব্বির হোসেনসহ কয়েকজন সেখানে গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের লোকজন বলেন, মামুনুর রশিদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমুনা রেলওয়ে শ্রমিক লীগের অতিরিক্ত সম্পাদক ছিলেন। তাকে কীভাবে দর্শনা স্টেশনে সরকারি পদে পোস্টিং দেয়া হলো, সেটি তাদের জানা নেই। তাদের ভাষ্য, তারা মামুনুর রশিদকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলেছেন। তবে তার সঙ্গে খারাপ আচরণ কিংবা শরীরে ধাক্কা দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার নাজমা খাতুন বলেন, ঘটনার সময় তিনি স্টেশনে ছিলেন না। তবে একজনের যোগদানকে কেন্দ্র করে স্টেশনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। মামুনুর রশিদকে যোগদানে বাধা দেয়ার জন্য লোক ভাড়া করার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে নাজমা খাতুন বলেন, এসব আমি করতে যাব কেন? এগুলো করার কোনো প্রশ্নই আসে না। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তবে তিনি জানান, দুপুরের পর মামুনুর রশিদের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়েছে। তখন তাকে স্টেশনে এসে যোগদান করতে বলা হয়েছে এবং তিনি তাকে যোগদান করিয়ে দেবেন বলেও জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দর্শনা স্টেশনে মামুনুর রশিদকে যোগদান করতে বাধা দেয়ার বিষয়টি জানতে পেরে তার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি রেল মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছে। মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, তিনি ওই স্টেশনে যোগদান করেছেন আমাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে (অনলাইনে)। তাকে দ্রুতই স্টেশনে পাঠাতে হবে। তার সব ব্যবস্থা আমরা করব।
অন্যদিকে দর্শনা স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার আশিকুর রহমান বলেন, স্টেশনে যোগদান করার জন্য একজন এসেছিলেন। পরে কয়েকজনের বাধার মুখে তাকে স্টেশনে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। তিনি যোগদান না করেই ফিরে যান।
দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে একজন রেল কর্মকর্তার দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারি আদেশে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ, অন্যদিকে স্টেশনে প্রবেশেই বাধার অভিযোগ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে এবং দ্রুত মামুনুর রশিদকে স্টেশনে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা করা হবে। ফলে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলওয়ে স্টেশনে সৃষ্ট এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অবসান ও সরকারি দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্টরা।


