নেহালপুর প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা-শৈলমারি-উজলপুর এলাকার বেদেপোতা মাঠে দেশের প্রথম ‘সোলার এগ্রি-পিভি ইন্টিগ্রেটেড উইথ সোলার ইরিগেশন পাম্প গ্রিড ইন্টিগ্রেশন’ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। একই জমিতে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেই বিদ্যুৎ দিয়ে সেচ পরিচালনার সমন্বিত এ উদ্যোগকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষির টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গতকাল বুধবার দুপুর ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের শৈলমারি-উজলপুর গ্রামের বেদেপোতা মাঠে প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। জার্মানভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এওত ইধহমষধফবংয-এর আয়োজনে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশন ব্রাঞ্চের যুগ্ম-সচিব মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিদের স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী গান ও বাদ্যের তালে তালে মাথাল ও গামছা পরিয়ে সংবর্ধনা দেয়া হয়। স্থানীয় কৃষকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। পরে আয়োজন করা হয় মনোজ্ঞ দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ঝজঊউঅ)-এর পরিচালক (উপসচিব) ইঞ্জিনিয়ার মুজিবুর রহমান, ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাসিফা আলী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এৎববহ ওহপষঁংরাব উবাবষড়ঢ়সবহঃ-এর ঊহারৎড়হসবহঃ ধহফ ঊহবৎমু চৎড়মৎধসসব গধহধমবৎ তানজিনা দিলশাদ এবং এওত ইধহমষধফবংয-এর ঊহবৎমু ঈষঁংঃবৎ ঈড়ড়ৎফরহধঃড়ৎ ঝঃড়ুধহশধ ঝঃড়ুধহড়াধ।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে বক্তব্য দেন ওহভৎধংঃৎঁপঃঁৎব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়সঢ়ধহু খরসরঃবফ (ওউঈঙখ)-এর গধহধমরহম উরৎবপঃড়ৎ এস এম মুনিরুল ইসলাম, কভড উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইধহশ, উযধশধ ঙভভরপব-এর ঝবহরড়ৎ চড়ৎঃভড়ষরড় গধহধমবৎ (ঊহবৎমু) ঈযৎরংঃরহব তরংং এবং ঢাকায় জার্মান ফেডারেল রিপাবলিকের দূতাবাসের ঐবধফ ড়ভ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ঈড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ টষৎরপয কষবঢ়ঢ়সধহহ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বজায় রেখে একই জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সৌরচালিত সেচব্যবস্থার সমন্বয় করা। অর্থাৎ জমি কৃষিকাজের জন্য ব্যবহারের পাশাপাশি ওপরের অংশে সৌর প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। সেই বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে কৃষিকাজের সেচে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বা বিক্রি করার সুযোগও থাকবে। এ ধরনের ব্যবস্থা কৃষিতে ডিজেলনির্ভর সেচ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবহারেও সাশ্রয় আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিকে আরও টেকসই করার জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। কৃষি উৎপাদন, সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাসিফা আলী তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ এবং কৃষি উৎপাদনকে একই ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়েভ ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, উজলপুর গ্রামের কৃষক আসলাম আলীর প্রায় তিন বিঘা জমিতে চুক্তির ভিত্তিতে প্রকল্পটি স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিজমির ব্যবহার অব্যাহত রেখে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেচব্যবস্থার সঙ্গে তা যুক্ত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্থানীয় কৃষকেরা প্রকল্প এলাকায় যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা নির্মাণের দাবি জানান। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান অতিথি মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান সংশ্লিষ্ট বিভাগে আলোচনা করে প্রকল্পে প্রবেশের রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন।
স্থানীয় কৃষকেরা আশা করছেন, প্রকল্পটি সফল হলে ভবিষ্যতে কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার আরও বাড়বে। এতে সেচের ব্যয় কমার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট ও পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়ক হবে। ওয়েভ ফাউন্ডেশন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কভড, ওউঈঙখ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। বক্তারা বলেন, কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত ব্যবহারের এই মডেল ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য কৃষিপ্রধান এলাকাতেও অনুসরণ করা যেতে পারে। তাদের মতে, কৃষিজমি রক্ষা, সেচ ব্যয় কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জাতীয় গ্রিডে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ যুক্ত করার ক্ষেত্রে এমন প্রকল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শৈলমারি-উজলপুরের বেদেপোতা মাঠের এই উদ্যোগকে শুধু একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক জহির রায়হান, সহকারী পরিচালক কিতাব আলী, সিনিয়র সমন্বয়কারী কামরুজ্জামান যুদ্ধ, আব্দুল আলীম সজল, উপসমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আসলাম আলীসহ স্থানীয় কৃষক, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তারা।


