দর্শনা অফিস:
দর্শনা রেলবাজারে অবস্থিত দর্শনা দারুস সুন্নাত সিদ্দীকিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম এবং শিক্ষক কক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের সময় নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ফলাফলও সন্তোষজনক হয়নি।
গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মাদ্রাসাটিতে সরেজমিনে গিয়ে এসব চিত্র দেখা যায়। এ সময় ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণির পাঠদান চলছিল। তবে এসব শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল আনুমানিক ৩৫ শতাংশ। দাখিল শ্রেণিতে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। পরে শিক্ষক কক্ষে গিয়ে চারজন শিক্ষককে উপস্থিত পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তারা নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় ব্যস্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী মিলিয়ে মোট ২২ জন কর্মরত থাকলেও সেদিন সরেজমিনে ৯ জন শিক্ষককে উপস্থিত পাওয়া যায়। শিক্ষার্থী উপস্থিতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় মাদ্রাসাটি থেকে ৭৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন পাস এবং ৪০ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ।
ফলাফল নিয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শফিউদ্দিন মোল্লা বলেন, নির্বাচনী পরীক্ষায় ৭৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২২ জন পাস করেছিল। পরে অভিভাবক ও ম্যানেজিং কমিটির চাপ এবং কমিটির নির্দেশে আবার পরীক্ষা নিয়ে সবাইকে পাস করিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। তার দাবি, এর ফলেই এসএসসি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। দাখিল শ্রেণিতে পাঠদান চলমান থাকার কথা জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, দাখিল শ্রেণিতে তো ক্লাস চলছে। তবে সরেজমিনে ওই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থী কাউকে পাওয়া যায়নি জানানো হলে তিনি বলেন, তাহলে হয়তো তারা চলে গেছে। আলিম ও ফাজিল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়েও তিনি বলেন, এসব শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থাকে না। যেদিন যে কয়জন শিক্ষার্থী আসে, তাদেরই ক্লাস করানো হয়। তবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পরও শিক্ষকেরা নিয়মিত পাঠদান করেন নাÑএমন অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাদ্রাসাটির ছাত্র-ছাত্রী কল্যাণ পরিষদের ছাত্রনেতারা বলেন, দিন দিন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিচের দিকে যাচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে তারা অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের একাধিকবার জানিয়েছেন। কিন্তু সমস্যাগুলো সমাধানে প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলে তাদের অভিযোগ। তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সুনাম রয়েছে। সেই সুনাম ধরে রাখতে শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়নে শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষকে আরও আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করে একটি ভালো ফলাফল উপহার দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য তানভির রহমান অনিক বলেন, শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে বলে তারা মনে করেন। আবার শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের শাসন করতে গেলে উল্টো শিক্ষকদের হুমকি দেয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটিতে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষকদের আরও আন্তরিক ও তৎপর হতে হবে। শিক্ষকদের না জানিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাবেÑএটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকÑসব পক্ষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয়ে ত্রুটি রয়েছে এবং পড়াশোনার মান নিয়েও সমস্যা আছে। এসব সমস্যা কাটিয়ে তুলতে ইতোমধ্যে অভিভাবক সমাবেশ করা হয়েছে। শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরার ব্যবস্থা ইতোমধ্যে করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক অনুপস্থিতি নিয়ে এমন অভিযোগ উঠলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নে তারা বদ্ধপরিকর।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষার পরিবেশÑসবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ফলাফলে পড়ে। তারা বলেন, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সুনাম ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পাঠদানের মান বাড়ানো এবং ফলাফল উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।


