দামুড়হুদা অফিস:
দীর্ঘদিন ধরে ছাগলের ঘরের পাশে জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ত, রোদে উত্তপ্ত হয়ে উঠত চালা। ছিল না নিরাপদ আশ্রয়, ছিল না নিজের বলতে একটুকরো জমি। এমন মানবেতর জীবন কাটছিল দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধ আমির হোসেন ও তার স্ত্রী সুমাইয়া খাতুনের। অবশেষে তাদের সেই দুর্দশার অবসান হয়েছে। পরিত্যক্ত পড়ে থাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি পাকা ঘর পেয়েছেন তারা। দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন আলমের মানবিক উদ্যোগ ও আন্তরিক সহযোগিতায় অসহায় এই দম্পতির জীবনে এসেছে নতুন ঠিকানা।
গতকাল সোমবার সকাল ১০টার দিকে কার্পাসডাঙ্গা ভূমিহীনপাড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দম্পতির হাতে ঘরের চাবি তুলে দেয়া হয়। কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান তাদের হাতে চাবি তুলে দেন। এ সময় কার্পাসডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য, গ্রাম পুলিশ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। নতুন পাকা ঘরের চাবি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আমির হোসেন ও তার স্ত্রী। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা আর কষ্টের জীবন পেছনে ফেলে নিরাপদ একটি ঘরে থাকার সুযোগ পাওয়ার আনন্দ যেন তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমির হোসেন ও তার স্ত্রী কয়েক বছর ধরে কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের ভূমিহীনপাড়ায় মৃত রহিম বকশের ছেলে সোবহান আলীর বাড়ির সামনে একটি ছাগলের ঘরের পাশে জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরে বসবাস করছিলেন। নিজেদের কোনো জমি বা ঘর না থাকায় সেখানেই কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছিলেন তারা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আমির হোসেন ও তার স্ত্রীর এমন অসহায় জীবনযাপনের খবর স্থানীয়দের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এলাকাবাসী। তারা একজন প্রকৃত ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন। এ জন্য তারা বিষয়টি জানান দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন আলমকে। বিষয়টি জানার পর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্যোগ নেন এসিল্যান্ড শাহীন আলম। তিনি কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমানকে ভূমিহীনপাড়ায় কোনো পরিত্যক্ত আশ্রয়ণের ঘর রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখার নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পেয়ে মাঠপর্যায়ে খোঁজ শুরু করেন ভূমি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, ভূমিহীনপাড়ায় একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের পর থেকেই পরিত্যক্ত অবস্থায় তালাবদ্ধ পড়ে আছে। ঘরটিতে কেউ বসবাস করেন না। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেও বিষয়টি নিশ্চিত হন তিনি।
পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন আলমের নির্দেশনায় ঘরটির বরাদ্দ ও ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয় যাচাই-বাছাই করা হয়। সেখানে কোনো পরিবার বসবাস না করায় এবং আমির হোসেন প্রকৃতপক্ষে ভূমিহীন ও অসহায় হওয়ায় ঘরটি তার পরিবারের জন্য হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়।
কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘরটি বাঘাডাঙ্গা গ্রামের ছয়ফল নামের এক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ ছিল। ঘরটি তৈরি হওয়ার পর থেকে তিনি কোনোদিন এখানে বসবাস করেননি। বাঘাডাঙ্গায় তার নিজের জমি-জায়গা ও ঘরবাড়ি সবই রয়েছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় স্যারের সার্বিক নির্দেশনায় ঘরটি যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ভূমিহীন আমির হোসেনকে দেয়া হয়েছে।
দামুড়হুদা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন আলম বলেন, সরকারি বরাদ্দের ঘর মিথ্যা তথ্য দিয়ে দখল করে রাখার অধিকার কারও নেই। যার ঘর নেই, প্রকৃত ভূমিহীন, সেই ঘর পাবে এটাই সরকারের উদ্দেশ্য। এমন একটি অসহায় পরিবারকে ঘর দিতে পেরে আমারও অনেক ভালো লাগছে।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এভাবে বরাদ্দ পাওয়া ঘরগুলোর নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। কোনো কারণে বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঘরে বসবাস না করলে কিংবা প্রকৃত যোগ্যতা না থাকলে যাচাই-বাছাই করে তা প্রকৃত অসহায় মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া উচিত।


