দামুড়হুদায় একই দিনে পৃথক দুটি অভিযান চালিয়ে দুটি বাল্যবিবাহ বন্ধ করেছে উপজেলা প্রশাসনÑএ ঘটনা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। একটি ঘটনায় প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে বরপক্ষ পালিয়ে যায় এবং অন্য ঘটনায় বাল্যবিবাহ আয়োজনের দায়ে কনের মা ও বরের মামাকে অর্থদণ্ড দেয়া হয়। একই সঙ্গে একটি পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়া হয়েছে, যাতে মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে, প্রশাসন চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশাসনের অভিযান দেখে বরপক্ষ পালিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কেন তৈরি হবে? একটি কিশোরীর বিয়ের আয়োজন যে পর্যন্ত গড়ায়, তার আগেই পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিষয়টি জানেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই তারা নীরব থাকেন। কোথাও আবার সামাজিক চাপ, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, কুসংস্কার কিংবা ‘মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার’ মানসিকতা বাল্যবিবাহকে টিকিয়ে রাখে। ফলে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বাল্যবিবাহ একটি শিশুর অধিকার হরণ করে। অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়েকে সংসারের দায়িত্বে ঠেলে দেয়া তার শিক্ষা, স্বাভাবিক বিকাশ, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে মাতৃত্বজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, বেড়ে যায় পারিবারিক সহিংসতা ও দারিদ্র্যের ঝুঁকিও। অর্থাৎ একটি বাল্যবিবাহ শুধু একজন কিশোরীর জীবনকেই প্রভাবিত করে না এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। দামুড়হুদার ঘটনাগুলোতে প্রশাসনের দুটি বিষয় বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। প্রথমত, তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালিয়ে বিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়নি। একটি পরিবারকে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বোঝানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্ত না নেয়ার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এই সমন্বিত পদ্ধতিই প্রয়োজন। কারণ শাস্তির পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি না হলে একই পরিবার বা অন্য পরিবারে একই প্রবণতা আবার ফিরে আসতে পারে। তবে প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের দায়িত্বও কম নয়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে স্থানীয় পর্যায়ে একটি সক্রিয় সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গ্রাম পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, নারী ও শিশু সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে প্রতিটি ইউনিয়ন ও গ্রামে এ বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার। কোনো কিশোরীর বিয়ের আয়োজন হচ্ছেÑএমন খবর পাওয়া মাত্র প্রশাসনকে জানানো গেলে অনেক বিয়ে আয়োজনের পর্যায়েই বন্ধ করা সম্ভব। অভিভাবকদেরও মনে রাখতে হবে, মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগে বিয়ে দেয়া কোনো ‘সমাধান’ নয়, বরং এটি তার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। মেয়েকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ দেয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো তাকে শিক্ষিত করে আত্মনির্ভর হওয়ার সুযোগ করে দেয়া। আর্থিক সংকট থাকলে পরিবারকে সহায়তার সামাজিক ও সরকারি ব্যবস্থাগুলোও কাজে লাগাতে হবে। দামুড়হুদায় একই দিনে দুটি বাল্যবিবাহ বন্ধের ঘটনা তাই কেবল দুটি বিয়ে বন্ধ হওয়ার খবর নয়, এটি স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বাল্যবিবাহের আয়োজনকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং একই সঙ্গে একটি শিশুর ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে গুরুতর অন্যায়। প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও দৃশ্যমান সাফল্য আসবে। তাই একটি-দুটি অভিযান নয়, বাল্যবিবাহ বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সামাজিক সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসারÑএই চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই আজ যে কিশোরীর বিয়ে বন্ধ হলো, আগামীকাল তার মতো আর কোনো কিশোরীর শৈশব ও ভবিষ্যৎ বিয়ের আসরে হারিয়ে যাবে না।


