চুয়াডাঙ্গায় একই দিনে পৃথক তিন ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে চারজনের মৃত্যুÑঘটনাগুলো নিছক কয়েকটি দুর্ঘটনার খবর নয়, এগুলো আমাদের অসচেতনতা, নিরাপত্তাবিধি না মানা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে পর্যাপ্ত সতর্কতার ঘাটতির নির্মম চিত্র। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়া যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি উদ্বেগজনকও। বিদ্যুৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ, কিন্তু সামান্য অসতর্কতাই যে এটিকে মুহূর্তে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে, চুয়াডাঙ্গার ঘটনাগুলো তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দামুড়হুদার লোকনাথপুরে টিউবওয়েলের বৈদ্যুতিক মোটরের তার চুরি করতে গিয়ে শরিফুল ইসলাম ওরফে বরুর মৃত্যু হয়েছে। ভোরে স্থানীয় এক নারী টিউবওয়েলের কাছে হাতে কাঁচি নিয়ে তাকে বিদ্যুতের তারের সঙ্গে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অবস্থায় দেখতে পান। ঘটনাটি যেমন দুঃখজনক, তেমনি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিরও ভয়াবহ পরিণতি এটি। বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করে বৈদ্যুতিক তার কাটতে যাওয়া কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, এ ঘটনা তারই প্রমাণ। এর কয়েক ঘণ্টা পর কালিয়াবকরী গ্রামে ঘটে আরও হৃদয়বিদারক ঘটনা। ঘাস কাটার মেশিন প্রস্তুত করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন লিটন আলী। স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে বিদ্যুতের সংস্পর্শে আসেন স্ত্রী লিপা খাতুনও। শেষ পর্যন্ত দুজনেরই মৃত্যু হয়। পাশাপাশি জীবন শুরু করা এই দম্পতিকে পাশাপাশি কবরেই শেষ ঠিকানা নিতে হয়েছে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়, তারা রেখে গেছেন দুটি ছোট কন্যাশিশু। একসঙ্গে বাবা-মাকে হারিয়ে ওই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। একটি মুহূর্তের দুর্ঘটনা যে একটি পরিবারের পুরো ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে, এই ঘটনা তার নির্মম উদাহরণ। অন্যদিকে আলুকদিয়ায় নিজ বাড়িতে ইজিবাইক চার্জ দেয়ার সময় প্রাণ হারিয়েছেন ইজিবাইকচালক নাসির উদ্দীন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন যে ইজিবাইক চালিয়ে সংসার চালাতেন, সেই ইজিবাইক চার্জ দিতে গিয়েই তার জীবন থেমে গেল। তিনটি ঘটনার ধরন আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের ভয়াবহ মিল রয়েছেÑবিদ্যুৎ ব্যবহারে নিরাপত্তার ঘাটতি। কোথাও বৈদ্যুতিক তার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, কোথাও বৈদ্যুতিক মেশিন ব্যবহারে অসতর্কতা, কোথাও আবার ইজিবাইক চার্জ দেয়ার সময় দুর্ঘটনা। অর্থাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত নানা দৈনন্দিন কাজেই নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখানে শুধু ব্যক্তিগত অসতর্কতাকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গ্রামাঞ্চলে অনেক বাড়ি, দোকান কিংবা খামারে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না। পুরোনো বা ত্রুটিপূর্ণ তার, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, অপরিকল্পিত সংযোগ, খোলা তার এবং অদক্ষ হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্র মেরামতÑসবই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে কৃষিকাজ, ঘাস কাটার মেশিন, পানির পাম্প, ইজিবাইক ও ব্যাটারি চার্জিংয়ের মতো কাজে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রে কাজ করার আগে অবশ্যই বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে হবে। ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্পর্শ করা যাবে না। ত্রুটিপূর্ণ তার বা খোলা সংযোগ দ্রুত মেরামত করতে হবে। বাড়িতে ইজিবাইক বা ব্যাটারি চালিত যানবাহন চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও মানসম্মত বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণÑকেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলে তাকে উদ্ধারের সময় অনেকেই সরাসরি শরীর ধরে টান দেন। এতে উদ্ধার করতে যাওয়া ব্যক্তিও বিদ্যুতের সংস্পর্শে এসে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিরাপদ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। প্রয়োজন হলে শুকনো, বিদ্যুৎ অপরিবাহী বস্তু ব্যবহার করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিদ্যুতের উৎস থেকে আলাদা করতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে। এ বিষয়ে গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন।
একটি জীবন বাঁচাতে কখনো কখনো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সতর্কতাই যথেষ্ট। সেই সতর্কতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। চুয়াডাঙ্গার এক দিনে চারটি প্রাণহানি যেন আমাদের জন্য আরেকটি সংখ্যা হয়ে না থাকে, বরং এটি হোক বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার, সচেতন হওয়ার এবং কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার একটি কঠিন শিক্ষা। বিদ্যুৎ আমাদের জীবনকে সহজ করবেÑঅসতর্কতার কারণে মৃত্যুর কারণ হবে না, এ নিশ্চয়তাই আমাদের প্রত্যাশা।


