নেহালপুর প্রতিনিধি:
ভিটেহীন ও হতদরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে নির্মাণ করা হয়েছিল আশ্রয়ন প্রকল্প। স্বপ্ন ছিল, একটি ঘর ঘিরে নতুন করে জীবন শুরু করবেন ভূমিহীন পরিবারগুলো। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই স্বপ্নের অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের দর্শনা ফুরশেদপুর আবাসনে। অর্ধশত বসতঘর নিয়ে গড়ে ওঠা এ আবাসন প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি ঘর এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোনো ঘরের টিন নেই, কোনো ঘরের দরজা-জানালা খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। লোকজন না থাকায় সন্ধ্যা নামলেই অনেক ঘর পরিণত হচ্ছে অন্ধকার ও নীরব পরিত্যক্ত স্থাপনায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পরিত্যক্ত ঘরকে ঘিরে মাদক কারবারিদের আনাগোনাও বেড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আবাসনের যেসব ঘরে এখন আর কেউ বসবাস করেন না, সেসব ঘর থেকে নিয়মিত টিন, দরজা-জানালা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে চোরেরা ঘরের অংশ খুলে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারি অর্থে নির্মিত পুরো আবাসন প্রকল্পটি একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুরশেদপুর আবাসনে প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি রয়েছে। একসময় এসব ঘরে নিম্নআয়ের ও ভিটেহীন পরিবারগুলোর বসবাস ছিল। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে অনেকে আবাসন ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ফলে একের পর এক ঘর খালি হতে থাকে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঘরগুলোও নষ্ট হতে শুরু করে। এখন অনেক ঘরের চালের টিন নেই। কোথাও দরজা-জানালা ভাঙা, কোথাও আবার সেগুলো খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরিত্যক্ত ঘরগুলোর দেয়াল ও কাঠামোতে দেখা দিয়েছে জরাজীর্ণতার ছাপ। দিনের বেলাতেও অনেক ঘরকে পরিত্যক্ত মনে হয়, আর সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা আরও নির্জন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই নির্জনতার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিরা। পরিত্যক্ত ঘরগুলোতে বসছে মাদকের আড্ডা। সেখানে মাদকদ্রব্য কেনাবেচার পাশাপাশি মাদকসেবীদের আনাগোনাও রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এতে আবাসন এলাকার পরিবেশ ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সন্ধ্যার পর আবাসনের পরিত্যক্ত ঘরগুলোর আশপাশে অপরিচিত লোকজনের চলাচল দেখা যায়। মাদকের কারবার বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান প্রয়োজন। তা না হলে পরিত্যক্ত ঘরগুলো আরও বড় ধরনের অপরাধের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, হতদরিদ্র মানুষের আবাসনের জন্য সরকারি অর্থে নির্মিত ঘরগুলো যদি এভাবে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার? সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে যেমন ঘরগুলো নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে অপরাধীদের জন্যও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, শুধু ঘর নির্মাণ করেই আশ্রয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব শেষ হওয়ার কথা নয়। প্রকল্পের ঘরগুলোতে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বসবাস নিশ্চিত করা, খালি ঘরগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং নিয়মিত নজরদারি থাকলে সরকারি সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালানো প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, ফুরশেদপুর আবাসনের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হোক। বিশেষ করে পরিত্যক্ত ঘরগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, চুরি বন্ধ এবং মাদকের আড্ডা উচ্ছেদে প্রশাসন ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ চান তারা। সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং আবাসন প্রকল্পের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে ফুরশেদপুর আবাসন আবারও তার মূল উদ্দেশ্য—ভূমিহীন ও হতদরিদ্র মানুষের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে ফিরে পাবে।


