একটি কিশোরী প্রাণের অকালমৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, একই সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। জীবননগরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সোহাগী খাতুনের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ তাই কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ১৪ বছরের একটি প্রাণ, যে বয়সে বই-খাতা আর স্বপ্ন নিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা, চিকিৎসা নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরেছেÑএ ঘটনা সত্যিই মর্মান্তিক। স্বজনদের অভিযোগ, অসুস্থ হয়ে জীবননগরের মনোয়ারা সনো সেন্টার অ্যান্ড নার্সিং হোমে ভর্তি হওয়ার পর সোহাগীর অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর বাড়ি ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। প্রচণ্ড বমি, মাথাব্যথা ও তীব্র জ্বর দেখা দিলে তাকে আবার ওই ক্লিনিকে নেয়া হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে একটি ঘুমের ইনজেকশন দেয়ার পর সোহাগী অচেতন হয়ে পড়ে এবং আর জ্ঞান ফেরেনি। পরে যশোর হয়ে তাকে ঢাকায় নেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলোÑসোহাগীর অস্ত্রোপচারের আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না এবং অস্ত্রোপচারের পর তার চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছিল কী-না। স্বজনেরা দাবি করেছেন, ঢাকার চিকিৎসকেরা আগের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার করার মতো মূল কোনো সমস্যা ছিল না। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি নিছক চিকিৎসাগত ভুল নয়, এটি চিকিৎসাসেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন। তবে অভিযোগ উঠেছে বলেই অভিযুক্ত চিকিৎসক বা ক্লিনিককে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দ্রুত তদন্তই হতে হবে সত্য উদ্ঘাটনের একমাত্র পথ। অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে একপক্ষের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না। কিন্তু একই কারণে ঘটনাটি চাপা পড়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক ও দায়ী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন প্রয়োজন সেই তদন্ত দ্রুত শুরু করা। একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় কেবল ‘লিখিত অভিযোগের অপেক্ষা’ দীর্ঘায়িত হলে মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট পরিবারকে অভিযোগ করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনীয় নথি ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত। দেশে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে। মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগও কিছুটা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেই নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত নার্স ও জনবল, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের সঠিক সিদ্ধান্ত, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার সক্ষমতা। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে বাড়তি সতর্কতা অপরিহার্য। আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণÑকোনো রোগীকে অস্ত্রোপচারের আগে তার রোগ নির্ণয়, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে রোগী বা অভিভাবককে যথাযথভাবে জানানো হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ, জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং প্রয়োজন হলে উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সোহাগীর পরিবার এখন সন্তান হারানোর শোকে বিধ্বস্ত। তদন্তের ফলাফল যাই হোক, তারা অন্তত জানতে চানÑকেন তাদের মেয়েটি মারা গেল। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অধিকার তাদের আছে। একই সঙ্গে এলাকার মানুষেরও জানার অধিকার রয়েছে, চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাদের জীবন কতটা নিরাপদ। আমরা চাই না সোহাগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুধু কয়েক দিনের আলোচনা হোক, তারপর বিষয়টি বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাক। নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়া হোক, চিকিৎসার সব নথি পরীক্ষা করা হোক এবং দায়িত্বে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। আবার অভিযোগের সত্যতা না মিললে অভিযুক্তদেরও যেন যথাযথভাবে দায়মুক্ত করা হয়। চিকিৎসা মানুষের শেষ আশ্রয়গুলোর একটি। সেই আশ্রয় যদি অনিয়ম, অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়, তবে তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্যই অশনিসংকেত। সোহাগী খাতুনকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সোহাগীর মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি নয়, এটি নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করারও দাবি।


