আলমডাঙ্গা অফিস:
আলমডাঙ্গায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় লোকমান হোসেন (প্রা.) হাসপাতালের মালিক লুৎফর রহমানকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স না থাকা, বৈধ লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ক্লিনিকের কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে গতকাল গতকাল রবিবার দুপুরে এ দণ্ড দেয়া হয়।
আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মহেশ্বর কুমার মণ্ডল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মেডিকেল প্র্যাকটিস ও বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিজ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১৩(২) ধারা অনুযায়ী এ দণ্ডাদেশ দেন। এর মাত্র তিন দিন আগে গত ২১ অক্টোবর একই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে ক্লিনিকটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশও দেয়া হয়েছিল।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, আগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ক্লিনিকটিতে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। এর মধ্যেই গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর সোনিয়া খাতুন (২৮) নামের এক প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। পরে তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে রাত ১০টার দিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত সোনিয়া খাতুন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের শাকদারচর গ্রামের রবি হোসেনের স্ত্রী। গত শনিবার দুপুরে আলমডাঙ্গা পৌর শহরের কলেজপাড়ায় অবস্থিত লোকমান হোসেন হাসপাতালে তার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার করেন চিকিৎসক নিলুফা ইয়াসমিন। অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পর সোনিয়ার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একপর্যায়ে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তবে সোনিয়ার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো তদন্তের ফল পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও চিকিৎসায় ত্রুটির কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে দ্বিতীয় তথ্যসূত্রে অভিযোগ করা হলেও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রসূতির মৃত্যুর পর গতকাল রবিবার দুপুরে লোকমান হোসেন হাসপাতালে যৌথ অভিযান চালায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে নেতৃত্ব দেন চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন আহমেদ সাঈদ এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর কুমার মণ্ডল। অভিযানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্লিনিক পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স সেখানে ছিল না। এছাড়া ক্লিনিকের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বৈধ সরকারি লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রও ছিল না বলে অভিযানে উঠে আসে। এসব অনিয়মের পাশাপাশি আগের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে কার্যক্রম চালানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়। মেডিকেল প্র্যাকটিস ও বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরিজ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ১৩(২) ধারায় মালিক লুৎফর রহমানকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মহেশ্বর কুমার মণ্ডল।
অভিযানকালে আলমডাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং আলমডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন পুলিশ সদস্যদের নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্লিনিকটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার আগের নির্দেশ বহাল থাকবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বৈধ লাইসেন্স এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত না করা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, অবৈধভাবে ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা এবং সরকারি বিধিনিষেধ অমান্য করার বিরুদ্ধে অভিযান ও আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানে জরিমানা ও কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়ার পরও কীভাবে সেখানে অস্ত্রোপচার করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স, জনবল ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়মিত তদারকির বিষয়টিও সামনে এসেছে।


