নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর পূজা-অর্চনা, অঞ্জলি নিবেদন, হোমযজ্ঞ ও মহাআরতি সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জেলার ১১৬টি পূজামণ্ডপে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ছিল ভক্তদের ভিড়, আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও সম্প্রীতির আবহ। আজ বুধবার বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। আনন্দমুখর উৎসবের শেষ দিনে তাই মণ্ডপে মণ্ডপে বাজবে বিদায়ের সুর, ভক্তদের চোখে থাকবে অশ্রু আর মনে থাকবে আগামী বছরের অপেক্ষা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গা শহর ও জেলার বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে ভক্তদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সকাল সাতটায় শহরের ফেরিঘাট সড়কের সত্য নারায়ণ মন্দিরে শুরু হয় পূজা-অর্চনা। পরে পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। একইভাবে জেলার অন্য মণ্ডপগুলোতেও মহানবমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও অঞ্জলি নিবেদন, কোথাও হোমযজ্ঞ, আবার কোথাও প্রসাদ বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করেন আয়োজক ও ভক্তরা। সন্ধ্যায় বিভিন্ন মণ্ডপে দেবীর মহাআরতি অনুষ্ঠিত হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনে আসেন নানা বয়সী মানুষ। প্রতিমার নান্দনিক সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও ধর্মীয় আয়োজন দেখতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভিড় করেন অনেকে। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। উৎসবের আনন্দে একদিকে যেমন ছিল ভক্তি ও শ্রদ্ধা, অন্যদিকে ছিল স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর উচ্ছ্বাস।
হিন্দুশাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিটÑমোট ৪৮ মিনিট ধরে এই পূজা করার রীতি রয়েছে। এ সময় দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, ১০৮টি প্রদীপ প্রজ্বালন ও ১০৮টি পদ্মফুল নিবেদনের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন করা হয়।
সনাতন ধর্মীয় আখ্যান অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির প্রতীক অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চণ্ড, মুণ্ড ও রক্তবীজসহ বিভিন্ন অসুরকে বিনাশ করেন। সেই পৌরাণিক কাহিনি স্মরণ করে মহানবমীতে দেবীর শক্তি, সাহস ও বিজয়ের বন্দনা করেন ভক্তরা। তাঁদের বিশ্বাস, দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।
মহানবমীর পূজা দিতে আসা ভক্ত সুমি রানী রায় বলেন, মহানবমী দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। এ দিনে মায়ের কাছে প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে সব অশুভ শক্তির বিনাশ হোক, মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। সবাই যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সনাতন ধর্মাবলম্বী অশোক দাসগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আমরা চাই, সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে পালন করুক। দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়, এটি এখন সর্বজনীন আনন্দের উৎসব। সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চাই। এবারের পূজার আয়োজন খুবই সুন্দর হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পূজামণ্ডপে এসেছিলেন অর্ণব চক্রবর্তী। তিনি বলেন, মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি, আলোকসজ্জা ও প্রতিমার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করছে। মায়ের কাছে সবার মঙ্গল ও সমৃদ্ধি কামনা করেছি। মহানবমী আমাদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি ভক্তি ও শ্রদ্ধার দিন। বন্ধুদের সঙ্গে পূজামণ্ডপে ঘুরছি, পূজার আনন্দ উপভোগ করছি। আমরা চাই, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে থাকুক। সমাজে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ না থাকুক।
আজ বুধবার বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, দশমীর পূজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হবে। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, মর্ত্যে ভক্তদের মধ্যে কয়েক দিনের অবস্থান শেষে দেবী দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে।
দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের মনে আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হবে বিষাদের আবহ। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসবের আনুষ্ঠানিক পর্ব। তবে দেবীর কাছে করা প্রার্থনা, শান্তি-সমৃদ্ধির প্রত্যাশা এবং ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মিলনমেলার স্মৃতি রয়ে যাবে ভক্তদের মনে। আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকবেন তারা।


