আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰‘নজরুলের সাম্য ও মানবতার দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে’📰দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ রুটে ট্রেন চালুর দাবি লোকমোর্চার📰অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও নিয়োগপত্র জালিয়াতি, অভিযুক্ত শাহজামাল গ্রেপ্তার📰দামুড়হুদায় ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত যুবকের গলা-ঘাড়ে কোপ, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ📰আলমডাঙ্গায় কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস📰চুয়াডাঙ্গায় নজরুল উৎসবে আবৃত্তি-নাটকে মুগ্ধ দর্শক📰জীবননগরে মনোহরপুরে ভৈরব নদের পাড়ে ২ হাজার গাছ কর্তন📰বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় আলমডাঙ্গার সাবেক ওসি বিপ্লব গ্রেপ্তার📰দামুড়হুদার নাটুদহে লংমার্চ উপলক্ষে জামায়াতের আলোচনা📰মাথাভাঙার ভাঙনে আতঙ্কে নগরবোয়ালিয়ার ১৫ পরিবার
হোম পেজমতামতসেতু নির্মাণে ধীরগতি, মানুষের দুর্ভোগের অবসান কবে?

সেতু নির্মাণে ধীরগতি, মানুষের দুর্ভোগের অবসান কবে?




উন্নয়ন মানে শুধু প্রকল্প গ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ কিংবা নির্মাণকাজের উদ্বোধন নয়; উন্নয়নের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করা। কিন্তু কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হলে এবং এর কারণে হাজার হাজার মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হলে সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বড়পুটিমারিতে একটি সেতুর নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা ঠিক এমনই এক জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরেছে। মাত্র ৩০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতুর নির্মাণকাজ ২৯ মাসেও ২০ শতাংশের বেশি এগোয়নিÑএটি কেবল একটি নির্মাণ প্রকল্পের ধীরগতির চিত্র নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি ও তদারকির প্রয়োজনীয়তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত। বড়পুটিমারির সেতুটি এ অঞ্চলের অন্তত ২০টি গ্রামের ২২ হাজারের বেশি মানুষের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। পুরোনো সেতুটি ভেঙে পড়ার পর নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন উইকেয়ার প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণের দায়িত্ব পায় যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মইনুদ্দিন বাঁশি। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া কাজ ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে আরও ছয় মাস সময় বাড়ানো হয়েছে। অথচ ২৯ মাসে কাজের অগ্রগতি মাত্র ২০ শতাংশ। ফলে বর্ধিত সময়ের মধ্যেও নির্মাণকাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি সেতুর নির্মাণকাজ এতটা পিছিয়ে পড়ল কেন? প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি সংস্থা এবং তদারককারী কর্তৃপক্ষের কাছে এর সুস্পষ্ট জবাব থাকা প্রয়োজন। কয়েক দিন কাজ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্মাণকাজ বন্ধ রেখে চলে যাওয়ার যে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দারা করেছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকার পেছনে অর্থ ছাড়, নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ, কারিগরি জটিলতা কিংবা ঠিকাদারের ব্যবস্থাপনাগত কোনো সমস্যা রয়েছে কী-না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ অনুসন্ধান না করে শুধু সময় বাড়িয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না বরং জনদুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সেতু নির্মাণে এই দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চুয়াডাঙ্গা ও আলমডাঙ্গা শহরে যেতে স্থানীয়দের অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে যাতায়াতের সময় ও ব্যয়। কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ থেকে উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নেয়া না গেলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, পচনশীল পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং কৃষকের লাভ কমে যায়। উৎপাদন খরচ ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ের চাপে এমনিতেই কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন। তার ওপর যোগাযোগব্যবস্থার এই প্রতিবন্ধকতা তাদের আর্থিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শুধু কৃষক নন, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদেরও প্রতিদিনের চলাচলে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। কর্মজীবী মানুষকে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বেশি। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেয়ার ক্ষেত্রেও যোগাযোগের এই বাধা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে হাসপাতালে যাওয়ার বাস্তবতা কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার পেছনে যে প্রয়োজনীয়তা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। একটি সেতু শুধু নদী, খাল কিংবা জলাশয়ের দুই পাড়কে যুক্ত করে না, এটি মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক যোগাযোগের পথও সুগম করে। সেতুটি চালু হলে ২০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে, কৃষিপণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় কমবে এবং শহরের সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগ আরও কার্যকর হবে। তাই এ প্রকল্পের কাজ আটকে থাকা মানে শুধু একটি অবকাঠামো অসম্পূর্ণ থাকা নয়, বরং একটি বিস্তীর্ণ জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়া। নির্মাণকাজের মান নিয়েও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, সেতুর কাজে ব্যবহৃত কিছু রডে মরিচা দেখা গেছে। অভিযোগটি সত্য কী-না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন অভিযোগকে উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য একটি সেতু দীর্ঘদিন মানুষের নিরাপদ চলাচলের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তাই নির্মাণের প্রতিটি ধাপে উপকরণের মান, নকশা অনুসরণ এবং কারিগরি মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদে নির্মাণের গুণগত মানের সঙ্গে কোনো আপস করা যাবে না। প্রয়োজনে স্বাধীন কারিগরি পরিদর্শনের মাধ্যমে উপকরণের মান যাচাই করে দেখা উচিত। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, ঠিকাদারের কাজের সক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতি যাচাই করা এবং নির্ধারিত সময়সীমা মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অংশ। আলমডাঙ্গা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মেজবাহুর রহমান জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ না হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার এই বক্তব্য বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। শুধু আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস যথেষ্ট নয়, কাজের অগ্রগতি দৃশ্যমান করতে হবে এবং জনগণকে তা জানাতে হবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা নতুন নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের ধীরগতিকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত না করে। সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ। এই অর্থ ব্যয়ে প্রতিটি প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো জনস্বার্থ নিশ্চিত করা। অথচ কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলেও যদি নিয়মিতভাবে সময় বাড়ানো হয়, তাহলে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রতিটি প্রকল্পে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি, অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বড়পুটিমারির সেতুর ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। প্রথমত, নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণ দ্রুত নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কাজ শেষ করার জন্য নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে অগ্রগতির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। চতুর্থত, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিয়ে ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ বা দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেতু নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের নিরাপদ চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ভাঙা সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচলের যে অভিযোগ রয়েছে, তা দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগকে পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল বন্ধ এবং সম্ভব হলে নিরাপদ অস্থায়ী যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সেতু নির্মাণে বিলম্বের দায় সাধারণ মানুষ বহন করলেও তাদের জীবন ও নিরাপত্তা অবহেলার শিকার হতে পারে না। বড়পুটিমারির মানুষের দাবি অযৌক্তিক নয়। তারা নতুন কোনো বিলাসী অবকাঠামো চাইছেন না, চাইছেন তাদের দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয় যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে দিতে। কৃষক চান তার উৎপাদিত ফসল সহজে বাজারে নিতে, শিক্ষার্থী চায় নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে যেতে, আর অসুস্থ রোগীর স্বজনেরা চান দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে। এসবই মানুষের মৌলিক দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতএব, বড়পুটিমারির সেতু নির্মাণকাজকে আর দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে ফেলে রাখা যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের গতি বাড়াতে হবে এবং নির্মাণের মান নিশ্চিত করে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের সাফল্য কাগজে-কলমে ব্যয় বা অগ্রগতির হিসাব দিয়ে নয়, মানুষের জীবনে তার বাস্তব সুফল দিয়ে বিচার করতে হবে। ২২ হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটানোই হোক বড়পুটিমারির সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। কারণ একটি সেতু নির্মাণে বিলম্ব মানে শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের কাজ থেমে থাকা নয়Ñথেমে থাকা মানুষের স্বাভাবিক জীবন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জরুরি প্রয়োজন পূরণের পথ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ