নিজস্ব প্রতিবেদক:
মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ, জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার্থী গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে ‘এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। নতুন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শুভ সূচনা উপলক্ষে উপদেষ্টা পরিষদের পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় চুয়াডাঙ্গা শহরের শহীদ আবুল কাশেম সড়কের সাহিদ গার্ডেনে এ সভার আয়োজন করা হয়। এতে জেলার শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জেলা পরিষদের প্রশাসক ও এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান শরীফুজ্জামান শরীফ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাসেম অনুরাগী। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
স্বাগত বক্তব্যে চেয়ারম্যান শরীফুজ্জামান শরীফ প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ আয়োজন নিছক পরিচিতি কিংবা মতবিনিময় সভা নয়, এটি একটি বৃহৎ স্বপ্নের আনুষ্ঠানিক যাত্রার সূচনা। চুয়াডাঙ্গায় আধুনিক, মানবিক, নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, এখান থেকে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফলের পাশাপাশি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে গড়ে উঠবে। শরীফুজ্জামান শরীফ জানান, এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ হবে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক একটি প্রতিষ্ঠান। দল-মত, জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও পেশা নির্বিশেষে সবার সন্তান এখানে সমান সুযোগ পাবে। মেধাবী ও প্রতিভাবান এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থাও থাকবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘খবধৎহ, খবধফ, ঝঁপপববফ’ এ স্লোগানকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের শেখা, চিন্তা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও সফলতার জন্য প্রস্তুত করা হবে। প্রাথমিকভাবে ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও ভবিষ্যতে বড় পরিসরে নিজস্ব ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ল্যাব, লাইব্রেরি ও আইসিটি ল্যাবের পাশাপাশি খেলাধুলা এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হবে। ক্যাডেট কলেজের আদলে শৃঙ্খলাপূর্ণ শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া হবে।
নার্সারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, গান, খেলাধুলা, হাতের লেখা, ইংরেজি ও আরবি ভাষা শিক্ষাসহ শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও প্রতিভা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকবে। শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে। রিটেন, ভাইভা ও ডেমো ক্লাস এই তিন ধাপের পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক নির্বাচন করা হবে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়ে শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সার্বক্ষণিক সিসি ক্যামেরা মনিটরিং এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থাও থাকবে। শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একা কোনো শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছে এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরও সচেতন থাকতে হবে। আমরা অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই।
সভায় বক্তব্য দেন চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সভাপতি নাজমুল হক স্বপন। তিনি বলেন, অভিভাবকেরা সন্তানকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট কিংবা বিজ্ঞানী হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু সন্তান কীভাবে একজন ভালো ও নৈতিক মানুষ হয়ে উঠবে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন একটি ভালো কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা তৈরি হবে।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গার শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তারা। সভায় প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা শিক্ষা কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন এবং প্রতিষ্ঠানটির সাফল্য কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট হেমায়েত উল্লাহ বেল্টু, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. মোফাজ্জল হোসেন, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান, মেহেরপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হাসানুজ্জামান মালিক, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সারোয়ার বাবু, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের পিপি আ. স. ম. আব্দুর রউফ, সংস্কৃতিকর্মী সরদার আলী হোসেন, শিক্ষানুরাগী সিরাজুল ইসলাম, সাবেক অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী, সাবেক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী বিশ্বাস, চিকিৎসক ডা. আসাদুর রহমান মালিক খোকন, অ্যাডভোকেট এম. শাহজাহান মুকুল, চুয়াডাঙ্গা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ইয়াকুব হোসেন মালিক। এছাড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটু, জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রশিদ ঝন্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব খান, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহজাহান খান, সাধারণ সম্পাদক মোমিন মালিতা, অরিন্দম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিরণ উর রশিদ শান্তসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরাও অংশ নেন। তাদের মধ্যে নিমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ বি এম আজমল হক ইকবাল, কুশডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এটিএম সাইফুল ইসলাম, সৃজনী মডেল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহাদ আলী মোল্লা, বেলগাছি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাফিজুর রহমান, হাজরাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এটিএম শামিউল ইসলাম, পুলিশ লাইন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আ.ক.ম. মইনুল আহসান পলাশ, বিএডিসির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইমদাদুল হক, ওদুদ শাহ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক বশির আহমেদ এবং এস এম জোহা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ওমর ফারুক উল্লেখযোগ্য।
আয়োজকেরা জানান, শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফল কিংবা সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় জ্ঞান, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের মূল লক্ষ্য। অনুষ্ঠান শেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষার্থীবান্ধব একটি আধুনিক, মানবিক ও নৈতিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে এলিট স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের সফলতা কামনা করেন।


