আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰সাংবাদিকের ওপর হামলা, প্রশ্ন নিরাপদ সাংবাদিকতার📰গাংনী ও মুজিবনগরে পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ ৩ ব্যক্তি গ্রেপ্তার, আটক ২📰আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে এখন বিদ্যুৎ প্রকল্প📰জীবননগরে রাতের আঁধারে দুই কলাবাগান কলা চুরি📰চুয়াডাঙ্গায় দোকান মালিক সমিতির নতুন কমিটির শপথ ও অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত 📰চুয়াডাঙ্গার আজমুলকে ‘ভাত চুরির’ অপবাদে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ📰সীমান্তে ঘুরে রাতের আঁধারে ফিরলেন শিক্ষকেরা📰চুয়াডাঙ্গা উপশম নার্সিং হোমে অপারেশন টেবিলে রোগীর মৃত্যু, ক্লিনিক ভাঙচুর📰আলমডাঙ্গাকে হারিয়ে ফাইনালে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা📰আলমডাঙ্গায় ট্রাক উদ্ধার , এজাহারে আসামি ও গাড়ির তথ্য বদল নিয়ে ধোঁয়াশা
হোম পেজঅর্থনীতিকেরুতে ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য নিট মুনাফা ১৬৫ কোটি টাকা

কেরুতে ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য নিট মুনাফা ১৬৫ কোটি টাকা




দর্শনা অফিস:

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত অধিকাংশ চিনিকল যখন বছরের পর বছর লোকসানের ভারে ন্যুব্জ, তখন ব্যতিক্রমী সাফল্যের গল্প লিখেছে চুয়াডাঙ্গার দর্শনার ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, অনিয়ম ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নের সুফলে প্রতিষ্ঠানটি ৮৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সম্ভাব্য নিট মুনাফার রেকর্ড গড়েছে।

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ইউনিটের সামগ্রিক আয়-ব্যয়ের আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিনি উৎপাদন ইউনিটে বড় অঙ্কের লোকসান হলেও ডিস্টিলারি ইউনিটের বিপুল মুনাফা সেই ঘাটতি শুধু পূরণই করেনি, বরং প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের উদ্বৃত্ত এনে দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ও ভ্যাট পরিশোধের পরও কেরুর সম্ভাব্য নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, চিনি কারখানায় সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। চিনি উৎপাদনের এই লোকসান কেরুর সার্বিক ব্যবসায় বড় চাপ তৈরি করলেও ডিস্টিলারি ইউনিটের আয় সেই চাপ অনেকটাই সামলে নিয়েছে। এ ইউনিট থেকে এককভাবে সম্ভাব্য মুনাফা এসেছে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বায়ো ফার্টিলাইজার বা জৈব সার ইউনিটের ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা, ফার্ম ইউনিটের ৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা, আকন্দবাড়ীয়া ইউনিটের ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ডিস্টিলারি ফার্মের ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা আয়। সব ইউনিটের আয়-ব্যয় সমন্বয় করে চিনি বিভাগের লোকসান বাদ দেয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা। কেরুর এই সাফল্যের পেছনে প্রশাসনিক সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান। তার ভাষ্য, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অনিয়ম, চুরি ও অপচয় বন্ধে একাধিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাবেই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, অতীতে টেন্ডার ও ট্যাপ চুরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এসব অনিয়ম ঠেকাতে কারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কারখানা চত্বরের সীমানাপ্রাচীরে কাঁটাতার দেয়া হয়েছে এবং অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের পথ বন্ধ করা হয়েছে। ফলে কারখানার সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি অপচয় ও অনিয়মও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহারেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ডিস্টিলারি ইউনিটে অটোমেশন চালু করা, স্বয়ংক্রিয় বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে চিনি ও জৈব সার উৎপাদনে রিকভারি বাড়ানোর জন্য নেয়া হয়েছে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ। এতে উৎপাদন দক্ষতা বেড়েছে এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কেরুর ডিস্টিলারি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক রাজিবুল হাসান বলেন, দেশে বিদেশি মদের আমদানি কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে কেরুর উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিভিন্ন নীতিগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের কারণে বিদেশি পণ্যের আমদানি কমায় স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা ও শ্রীমঙ্গলের মতো বড় গুদামগুলোতে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে ডিস্টিলারি ইউনিটে উৎপাদন কার্যক্রম গতিশীল রাখতে হচ্ছে। বর্তমানে কেরুর কারখানাগুলোর বার্ষিক সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে ১ কোটি ৩৫ লাখ প্রুফ লিটারে দাঁড়িয়েছে।

১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। দীর্ঘ ৮৮ বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিল্প খাতের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বর্তমানে এখানে বিভিন্ন ধরনের অ্যালকোহলিক পানীয়ের পাশাপাশি মল্ট ভিনেগার, হোয়াইট ভিনেগার ও জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনো চিনি বিভাগ। একদিকে ডিস্টিলারি থেকে বিপুল মুনাফা এলেও চিনি উৎপাদনে লোকসান প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আর্থিক অবস্থায় চাপ তৈরি করছে। ফলে কেরুর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য চিনি বিভাগকে লাভজনক করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চিনি বিভাগের লোকসান কমাতে ইতোমধ্যে আখের মূল্য বাড়ানো, কৃষকদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আখ চাষে কৃষকদের আরও উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির এই রেকর্ড মুনাফা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, অপচয় রোধ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ কেরুর সাম্প্রতিক আর্থিক সাফল্য তারই একটি দৃষ্টান্ত। তবে শুধু ডিস্টিলারি বিভাগের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক রাখা সম্ভব হবে না। চিনি বিভাগে লোকসান কমানোই এখন কর্তৃপক্ষের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসএফআইসির দিকনির্দেশনায় আখের উৎপাদন বাড়ানো, উন্নত জাতের আখের ব্যবহার, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ানো গেলে চিনি বিভাগকেও লাভজনক ধারায় ফেরানো সম্ভব বলে আশাবাদী কেরু কর্তৃপক্ষ।

একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প মানেই লোকসান এমন ধারণার বিপরীতে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সাম্প্রতিক সাফল্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ঘুরে দাঁড়াতে পারে, ৮৮ বছরের পুরোনো এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড মুনাফা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ