আলমডাঙ্গা থেকে আল-আমিন হোসেন:
চুয়াডাঙ্গার বিএডিসির গোডাউন থেকে বরাদ্দ করা ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার পাচারের অভিযোগে একটি ট্রাকসহ বিপুল পরিমাণ সার আটক করেছেন স্থানীয় লোকজন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাকের চালককে আটক করে। গতকাল রবিবার সকালে চুয়াডাঙ্গা-হাটবোয়ালিয়া সড়কের চিৎলা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে হাপানিয়া ক্যাম্পের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সারসহ ট্রাকটি ও চালককে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে দুপুরে আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে ট্রাকটি আলমডাঙ্গা থানা হেফাজতে নেন। এ সময় সার পরিবহনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী মিনারুল ইসলাম ও ট্রাকের চালককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। তবে দিন শেষে আদালতের মাধ্যমে এ ঘটনায় ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আটক সার জব্দ করা হয় এবং অভিযুক্তদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় লোকজনের দাবি, সরকারি সার বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সময় ট্রাকটি আটক করা হয়। একসঙ্গে ৪৪০ বস্তা টিএসপি সার পরিবহনের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আটক ট্রাকটির নম্বর ঝিনাইদহ-ট-১১-১১৪৫। ট্রাকের সঙ্গে থাকা চালানে পণ্যের বিবরণে টিএসপি সার, পরিবহনের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য হাতে লেখা ছিল। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, চালানে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে আটক সার, ট্রাকটির গন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। এ কারণে চালানটির বৈধতা এবং ওই চালানের ভিত্তিতে সার পরিবহনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এ ধরনের চালানের আড়ালে যদি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সার এক স্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে বড় ধরনের অনিয়মের বিষয় থাকতে পারে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, একদিকে সরকারি বরাদ্দের সার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় তারা কাক্সিক্ষত পরিমাণ সার পাচ্ছেন না। সার না পেয়ে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বিক্ষোভ, হাতাহাতি এমনকি গুদাম লুটের মতো ঘটনাও ঘটছে। তাদের প্রশ্ন, কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সার যদি নির্ধারিত ব্যবস্থার বাইরে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে মাঠপর্যায়ে কৃষকেরা কীভাবে সময়মতো সার পাবেন? স্থানীয় কয়েকজন কৃষকের দাবি, শুধু একটি ট্রাক আটক করে জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারি সার সরবরাহব্যবস্থার কোথাও অনিয়ম থাকলে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, ব্যবসায়ী কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তার যোগসূত্র থাকলে তাদেরও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
আটক সারগুলো আলমডাঙ্গা উপজেলার ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের মুদি ব্যবসায়ী মিনারুল ইসলামের বলে জানা গেছে। সার আটকের পর মিনারুল ইসলাম দাবি করেন, সারগুলো যশোরের নওয়াপাড়া থেকে ট্রাকে করে আনা হচ্ছিল। ইউনিয়নের কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ করতে না পারায় নওয়াপাড়া থেকে সার এনে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে তিনি জানান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নে তার ‘মিনারুল স্টোর’ থেকে এর আগেও বিপুল পরিমাণ সার উদ্ধার করেছিল উপজেলা কৃষি অফিস। অনুমোদিত সরকারি ডিলার পয়েন্টে থাকার কথা যে পরিমাণ সার, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ সার নিয়মিতভাবে তার গোডাউনে মজুত থাকার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ওই গোডাউনে থাকা সার শুধু ভাংবাড়িয়া ইউনিয়নের কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয় না, আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও এলাকাতেও এসব সার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা বড় কোনো সার সরবরাহকারী চক্র জড়িত থাকতে পারে বলেও অভিযোগ করছেন তারা।
আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, মিনারুল ইসলামকে এর আগেও সার-সংক্রান্ত কারণে একাধিকবার মুচলেকা দিতে হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকেলে ট্রাক, চালক ও মিনারুল ইসলামকে আলমডাঙ্গা থানায় নেয়া হয়। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আলমডাঙ্গা উপজেলা প্রাঙ্গণে নেয়া হয়। সন্ধ্যার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর আক্তারের উপস্থিতিতে আদালতের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে আটক সার জব্দ করা হয় এবং অভিযুক্তদের ছেড়ে দেয়া হয়।
এদিকে সার আটকের ঘটনায় শুধু ট্রাক জব্দ ও জরিমানা করে বিষয়টি শেষ করার পক্ষে নন অনেক কৃষক। তাদের দাবি, সরকারি সার কীভাবে নির্ধারিত উৎস থেকে বের হয়ে অন্যত্র যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কৃষকেরা জানান, একই ব্যবসায়ীর দোকান বা গোডাউন থেকে অতীতেও সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটে থাকলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে কারা জড়িত, সরকারি বরাদ্দের সার কীভাবে তার কাছে পৌঁছেছে, কোথা থেকে সার আনা হয়েছে এবং কোথায় সরবরাহের পরিকল্পনা ছিলÑএসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের আরও দাবি, তদন্তে কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যোগসূত্র পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি সার সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়িয়ে প্রকৃত কৃষকের কাছে বরাদ্দের সার পৌঁছানো নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। কারণ, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার যদি সরবরাহব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে অন্যত্র চলে যায়, তাহলে শুধু একটি ট্রাক আটক বা জরিমানা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে নাÑএমনটাই মনে করছেন স্থানীয় কৃষকেরা।


