নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গা শহরের হাসান চত্বরের বর্তমান অবস্থা, সরকারি কলেজের সামনের অবৈধ দোকানপাট, বাস-ইজিবাইক মালিকদের বিরোধ এবং নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের মাসিক সভায় আলোচনা হয়েছে। সভায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে মাদক ও চোরাচালান দমন, যানজট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তদারকি এবং আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
গতকাল রবিবার সকাল ১০টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহারের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ। সভায় পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসককে জানানো উচিত। তবে আগে থেকে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি জানানোর পর শুধু বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের শামিল। তিনি বাস ও ইজিবাইক মালিক সমিতির মধ্যকার বিরোধ দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান। তার বক্তব্য, পরিবহন খাতের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সুবিধা ও ভোগান্তির বিষয়টি সবার আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। কোনো সিদ্ধান্তের কারণে যাত্রীরা যেন হয়রানি বা দুর্ভোগের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় বিশেষ অতিথি শরীফুজ্জামান শরীফ চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সামনে দোকানপাট গড়ে ওঠার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, অতীতে একজন সাংবাদিকের উদ্যোগে সেখানে সাবেক জেলা প্রশাসক গিয়ে ওই সাংবাদিকের প্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর থেকে সেখানে অনেক দোকান গড়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। শরীফুজ্জামান শরীফ বলেন, যেখানে জেলা প্রশাসক নিজে গিয়ে কোনো স্থাপনা উদ্বোধন করেন, সেখানে সেই স্থাপনা উচ্ছেদ করার সাধ্য কার আছে? প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তাকেও সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তবে তিনি সেখানে যাননি বলে জানান।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, হাসান চত্বর মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত একটি জায়গা। এটি উচ্ছেদের পর সেখানকার পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে, তা তিনি জানেন। তিনি বলেন, হাসান চত্বর আমাদের একটা আবেগের জায়গা। ওখানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি রয়েছে, পাশাপাশি জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতিও রয়েছে। সেই হাসান চত্বর উচ্ছেদ করার পর কী অবস্থা আমাকে সামাল দিতে হয়েছে, আমি খুব ভালো করে জানি। তারপরে এখন গিয়ে দেখেন হাসান চত্বরের কী অবস্থাÑএই পাশ থেকে দোকান উঠিয়ে দেয়া হয়েছে, সব ওই পাশে বসেছে।
প্রশাসনের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে মন্তব্য করেন, বিভিন্ন পক্ষ প্রশাসনকে টাকা দিয়ে নিজেদের কাজ করিয়ে নেয়। বাসের ধর্মঘট কিংবা দোকানপাটের বিষয়ে প্রশাসনকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও তোলা হয়। জেলা প্রশাসক প্রশ্ন তুলে বলেন, যেকোনো কিছু হলে প্রশাসন টাকা দিয়ে ম্যানেজ হচ্ছে, বাসের ধর্মঘট চলছে, বাসচালকেরা নাকি এসে প্রশাসনকে টাকা দিয়ে যাচ্ছে, দোকানদারেরা প্রশাসনকে টাকা দিয়ে যাচ্ছেÑডিসি অফিস কি তাহলে টাকার মধ্যে ভাসছে? চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সামনে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, একদিকে এসব দোকানের মাধ্যমে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে স্থায়ীভাবে বসে থাকা দোকানপাটের কারণে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। জেলা প্রশাসক বলেন, ভ্রাম্যমাণ দোকানিরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি জায়গায় স্থায়ীভাবে বসে থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবতে হবে। তার অভিযোগ, দোকানের পেছনের এলাকায় ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনা এবং মাদক কেনাবেচার মতো কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। এতে কলেজের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলাকাটি পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল রাখতে সবার সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, একা তার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সবাই সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে এলাকাটি পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব হবে এবং সেই উদ্যোগ টেকসই হবে।
সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি ও পুলিশকে আরও তৎপর হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। যুবসমাজকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার এবং মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপনের জন্য জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি জোরদার, ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরসন ও নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়।
সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি এম তারিক উজ জামান। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি এম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক শারমীন আক্তার, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র, আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার, দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাভলী ইয়াসমিন, জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা এ্যানি এবং সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়াউদ্দিন আহমেদ। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মামুনুল হাসান, জেলা তথ্য কর্মকর্তা শিল্পী মণ্ডল, চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সফিকুল ইসলাম পিটু, পৌর বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মনি, চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম সনিসহ বিজিবি, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।


