জীবননগরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার খবরটি নিছক একটি স্বাস্থ্যসংবাদ নয়, এটি জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা। চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে সাধারণ জ্বর ও ডেঙ্গুর নানা উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে আসছেন। পরিস্থিতি বলছে, ডেঙ্গু এখন আর কেবল বর্ষাকালের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি প্রতিরোধে নিয়মিত ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবা অবশ্যই জরুরি। জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছেÑএটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু হাসপাতালে রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়ার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধ। আর সেই প্রতিরোধের মূল জায়গা হাসপাতাল নয়, মানুষের ঘরবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য ও পরামর্শ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ড্রেন, বাথরুম, ফুলের টব, ফ্রিজ বা এসির ট্রে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রÑসামান্য পানি জমে থাকলেই সেখানে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হওয়ার জন্য বড় কোনো জলাশয়ের প্রয়োজন নেই, একটি ছোট পাত্রে জমে থাকা পানিই যথেষ্ট। এই বাস্তবতাটি মানুষের মধ্যে যত দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া যাবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ তত বেশি কার্যকর হবে। তাই জীবননগরে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতার ধারাবাহিক অভিযান। শুধু কোনো একটি দিন পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে কিংবা মশক নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। এডিস মশা নির্মূলে নিয়মিত নজরদারি, প্রজননস্থল শনাক্তকরণ ও তা ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকেও এই কাজে যুক্ত করা দরকার। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অবশ্য নাগরিকদের। বাড়ির সামনে পানি জমে আছে কি না, ছাদে কোনো পাত্রে পানি পড়ে আছে কি না, ফুলের টব কিংবা ফ্রিজ-এসি ব্যবহারের পর কোথাও পানি জমে থাকছে কি নাÑএসব দেখার দায়িত্ব শুধু সরকারি সংস্থার নয়। প্রত্যেক পরিবার সপ্তাহে অন্তত এক দিন নিজেদের বসতবাড়ি ও আশপাশ ভালোভাবে পরিদর্শন করতে পারে। যেখানে পানি জমেছে, তা অপসারণ করতে হবে। পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও অন্যান্য বর্জ্য যথাস্থানে ফেলতে হবে। কারণ একজনের অসচেতনতা শুধু তার নিজের পরিবারকেই নয়, আশপাশের বহু মানুষকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা। জ্বর হলেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আবার জ্বরকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলাও করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং রোগীর পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তীব্র পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট বা অচেতনতার মতো বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা নেয়া অনেক ক্ষেত্রেই জটিলতা কমাতে পারে। জীবননগরে সেপ্টেম্বর মাসে ৪০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া নিঃসন্দেহে সতর্কসংকেত। এই সংখ্যা আরও বাড়ার পর অপেক্ষা করে ব্যবস্থা নেয়া হবেÑএমন নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। প্রশাসনকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে, স্বাস্থ্য বিভাগকে চিকিৎসা ও পরামর্শ দিতে হবে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র হাসপাতাল নয়Ñনিজের ঘর, আঙিনা ও আশপাশের পরিবেশ। তাই জীবননগরে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একটি ছোট পানির পাত্রও যেন এডিস মশার প্রজননস্থল না হয়Ñএই সচেতনতাই হোক প্রতিটি পরিবারের অঙ্গীকার। কারণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপটি হয়তো আমাদের হাতের কাছেইÑনিজের ঘর ও আঙিনা পরিষ্কার রাখা।


