দর্শনা অফিস:
চুয়াডাঙ্গার দর্শনা আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর দুই ভারতীয় যাত্রীর কাছ থেকে কসমেটিকস, শাড়ি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন পণ্য আটকের অভিযোগ উঠেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র বিরুদ্ধে। আটক করা পণ্যের বিপরীতে কোনো রসিদ বা লিখিত কাগজ দেয়া হয়নি এবং পণ্য ফেরত না দিয়ে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও পাসপোর্ট লক বা কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ওই দুই যাত্রী।
তবে বিজিবি জানিয়েছে, তাদের মধ্যে একজন বিজনেস ভিসায় বাংলাদেশে এসে ব্যবসায়ীক উদ্দেশ্যে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পণ্য বহন করছিলেন। অতিরিক্ত পণ্য ব্যাগেজ বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় সেগুলো আটক করা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, আটক পণ্য কাস্টমসে জমা দেয়া হবে এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে দর্শনা কাস্টমস জানিয়েছে, বিজিবির পক্ষ থেকে পণ্য কাস্টমসে জমা দেয়ার পরই পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও আটকের কারণ যাচাই করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। পণ্য কাস্টমসে জমা না পড়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কাস্টমসের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগকারী দুই ভারতীয় নাগরিক হলেন রাহেন মন্ডল (পাসপোর্ট নম্বর ত৬৬৫২৮০৯) ও অভিজিৎ বিশ্বাস (পাসপোর্ট নম্বর ত৬৬৫২৩৩৫)। তাদের বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার বানপুর বাগানপাড়া ও গাজনা পশ্চিমপাড়া এলাকায়। তাদের ভাষ্য, রাহেন মন্ডল বিজনেস ভিসায় এবং অভিজিৎ বিশ্বাস টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।
দুই যাত্রীর অভিযোগ, ভারতের গেদে সীমান্তে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তারা দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে কসমেটিকস, শাড়ি, থ্রি-পিস ও কিছু খাদ্যজাতীয় পণ্য ছিল। বাংলাদেশে প্রবেশের পর দর্শনা বিজিবি চেকপোস্টে তাদের মালামাল তল্লাশি করা হয়। তল্লাশির একপর্যায়ে কিছু পণ্য রেখে দেয়া হয় বলে অভিযোগ তাদের। রাহেন মন্ডলের দাবি, তারা ছোট ছোট ব্যাগে করে পণ্য বহন করেছিলেন। কাস্টমসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কর-শুল্ক পরিশোধ করেই এসব পণ্য বাংলাদেশে আনা হয়েছে বলে দাবি তার। বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে এসব পণ্য বিক্রি করেন বলেও জানান তিনি। রাহেন মন্ডলের আরও অভিযোগ, পণ্য আটকের পর তাকে কোনো রসিদ বা লিখিত কাগজ দেয়া হয়নি। পণ্য কোথায় রাখা হয়েছে বা কোন আইনে সেগুলো আটক করা হয়েছে, সে বিষয়েও কোনো কাগজ দেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
অপর যাত্রী অভিজিৎ বিশ্বাসের ভাষ্য, তাদের সঙ্গে থাকা কসমেটিকস, থ্রি-পিস ও শাড়ির কিছু পণ্য রেখে দেয়া হয়েছে। কোনো পণ্য অবৈধ হলে কাস্টমসের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার দাবি, আটক পণ্য কাস্টমসে জমা দিয়ে একটি মেমো বা রসিদ দেয়ার অনুরোধ করলেও তা দেয়া হয়নি। ভিডিও কথোপকথনে ওই যাত্রীকে আরও বলতে শোনা যায়, চারটি শাড়ির মধ্যে দুটি ফেরত দেয়া হলেও কসমেটিকসসহ আরও কিছু পণ্য ফেরত দেয়া হয়নি। একই সঙ্গে তাদের পাসপোর্ট লক করে দেয়া বা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রবেশে কালো তালিকাভুক্ত করার হুমকি দেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
দর্শনা কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদুল আলম বলেন, অপর্যটক যাত্রীদের জন্য ২০২৫ সালের ব্যাগেজ বিধিমালা রয়েছে। স্থলপথে বাংলাদেশে আসা অপর্যটক যাত্রীদের ক্ষেত্রে ওই বিধিমালায় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্য আনার বিধান রয়েছে। তবে কোনো পণ্য ব্যাগেজ বিধিমালার বাইরে রয়েছে কী-না, সেটি পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট বিধান যাচাই করেই নির্ধারণ করতে হবে বলে জানান তিনি। রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, ব্যাগেজ বিধিমালার আওতায় কোনো পণ্য আটক করা হলে তা কাস্টমসে জমা দেয়ার কথা। পণ্য কাস্টমসে জমা পড়ার পর পণ্যটি কী, কত পরিমাণ এবং কোন কারণে আটক করা হয়েছে—এসব বিষয় যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কোনো পণ্য ব্যাগেজ বিধিমালার বাইরে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আবার কোনো পণ্য অবাধে আমদানিযোগ্য হলে নির্ধারিত কর-শুল্ক আদায় করে তা ছেড়ে দেয়ার সুযোগ থাকতে পারে। আর শর্তযুক্ত আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বিজিবি কোথা থেকে পণ্যগুলো আটক করেছে বা কী প্রক্রিয়ায় আটক করেছে, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, পণ্য কাস্টমসে জমা পড়ার পরই বিষয়টি যাচাই করে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব। ফলে দুই ভারতীয় যাত্রীর অভিযোগ এবং বিজিবির ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আটক করা পণ্যগুলো ঠিক কী পরিমাণ ও কী ধরনের, সেগুলো ব্যাগেজ বিধিমালার আওতায় পড়ে কী-না এবং আটকের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কী-না। এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে পণ্যগুলো কাস্টমসে জমা পড়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে।
অভিযোগের বিষয়ে বিজিবি-৬’র পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, সংশ্লিষ্ট যাত্রী বিজনেস ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন। বিজনেস ভিসা নিয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত পরিমাণ পণ্য ব্যাগেজ হিসেবে আনার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বিজনেস ভিসায় ব্যবসায়িক নমুনা হিসেবে সীমিত পরিমাণ পণ্য আনা যেতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত পণ্য বহন করা ব্যাগেজ বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংশ্লিষ্ট যাত্রীর কাছে পণ্যের পরিমাণ বেশি থাকায় সেগুলো আটক করা হয়েছে। বিজিবি-৬’র পরিচালক আরও বলেন, আটক করা অতিরিক্ত পণ্য কাস্টমসে জমা দেয়া হবে। এরপর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।


