নিজস্ব প্রতিবেদক:
শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি)’র দায়িত্বপূর্ণ দুই জেলার সীমান্তবর্তী ২৪টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন, যশোরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ২২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় প্রায় দুই হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তারা টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকা দুটি এবং সীমান্তের আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ২২টি পূজামণ্ডপকে এ পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করতে পারেন, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বিজিবি। পাশাপাশি গুজব, অপতথ্য ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রতিরোধ এবং অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি)’র পরিচালক ও অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বাংলাদেশের ঐতিহ্য। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গুজবে কান না দেয়া, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করা এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি, বস্তু বা কর্মকাণ্ড চোখে পড়লে দ্রুত নিকটস্থ বিজিবি ক্যাম্প কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানান।
বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়ন, যশোরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ২২২টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় প্রায় দুই হাজার সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছেন রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সিংনগর পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান। পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে ছিলেন মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল আলম। এ সময় রিজিয়ন কমান্ডার পূজামণ্ডপ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের হাতে ফলের ডালা ও নগদ অর্থসহায়তা তুলে দেন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য ১০ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত যশোর রিজিয়নের বিভিন্ন বিজিবি ইউনিটের মাধ্যমে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় রেকি সম্পন্ন করা হয়েছে। ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে। তিনি আরও জানান, দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকার ছয় জেলার ৩৭টি উপজেলার আট কিলোমিটারের মধ্যে থাকা পূজামণ্ডপ এবং খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা শহরের মোট ২২২টি মণ্ডপ নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে। এসব মণ্ডপে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে ৫৮টি বেইজ ক্যাম্প থেকে। রিজিয়ন কমান্ডার বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষিত রেখেই দুর্গাপূজায় বিজিবি সদস্যরা পেশাদারত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে তিনি নাগরিক, পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন।
দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লুৎফুন নাহার। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় সনাতন ধর্মাবলম্বী ও পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময় করেন তিনি। জেলা প্রশাসক আশ্বস্ত করেন, উৎসবের আনন্দ অক্ষুণ্ন রাখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিদর্শনকালে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক এবং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, দামুড়হুদা উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লাভলী ইয়াসমিন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলো ঘুরে দেখেন। এ সময় মণ্ডপের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ভক্তদের যাতায়াতের সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নেন। ইউএনও পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের সরকারি নির্দেশনা মেনে উৎসব আয়োজনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে উৎসব পালন করতে পারেন, সে জন্য উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।
এ বছর চুয়াডাঙ্গা জেলার চার উপজেলায় মোট ১১৬টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদরে ৩৩টি, আলমডাঙ্গায় ৩৯টি, দামুড়হুদায় ২০টি এবং জীবননগরে ২৪টি মণ্ডপ রয়েছে। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ আলমডাঙ্গায়। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দুর্গোৎসব ঘিরে জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, রং, প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার কাজ শেষ করে উৎসবের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা শহরের দৌলাতদিয়াড় দক্ষিণ পাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির, বড় বাজার সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, সত্যনারায়ণ মন্দির, তাতলতলা মন্দির ও মালোপাড়া মন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপে সাজসজ্জার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় সিসিটিভি ও নাইটভিশন ক্যামেরা স্থাপন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত রাখা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরেও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিজিবি ও পূজা উদ্যাপন কমিটির সমন্বিত উদ্যোগে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।
আলমডাঙ্গা অফিস জানিয়েছে, বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার। এদিন মহাষষ্ঠীতে দেবী দুর্গার বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পঞ্জিকা অনুযায়ী, শনিবার ও রবিবার মহাসপ্তমী, সোমবার মহাঅষ্টমী এবং মঙ্গলবার মহানবমী পালিত হবে। অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ সন্ধিপূজা। এরপর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসব।
এ বছর আলমডাঙ্গা উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় মোট ৩৯টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে আলমডাঙ্গা পৌরসভা এলাকায় রয়েছে ১৫টি মণ্ডপ। পূজাকে ঘিরে এরই মধ্যে প্রতিটি মণ্ডবের প্রস্তুতি প্রায় শেষের পর্যায়ে। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে ফিরে যাবেন। উৎসবকে সামনে রেখে আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।


