খাসখবর ডেস্কঃ
গেন্ডারিয়ায় অস্ত্রসহ মাদকবিরোধী অভিযানে সৃষ্ট বিতর্কের জেরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বেচ্ছায় অব্যাহতির ঘোষণা দেন তিনি।
ইশরাক হোসেন জানান, গেন্ডারিয়ার মাদকবিরোধী অভিযানের জেরে সৃষ্ট বিতর্কের পর তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান এবং দল বা সরকারকে বিব্রত না করতে পদত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শুনে সম্মত হন এবং তাঁকে ঢাকা-৬ আসনসহ স্থানীয় এলাকার মাদক নির্মূলের কাজে মনোযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এখন থেকে দলীয় অনুমতি সাপেক্ষে তিনি শুধু ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে এলাকার উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাবেন।
পদত্যাগের ঘোষণা দিতে প্রেস ক্লাবে ইশরাক হোসেনজাতীয় প্রেস ক্লাবে ইশরাক হোসেন। সংগৃহীত ছবি
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে ইশরাক হোসেন জানান, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গেন্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন ঘুন্টিঘর এলাকায় মাদকের ডিস্ট্রিবিউশন হাব গড়ে উঠেছিল। আশপাশের গৃহমালিকদের জিম্মি করে এই কারবার চালানো হচ্ছিল। এলাকাবাসীর বারবার অভিযোগের পর ওয়ারীর ডিসি, লালবাগ জোনের ডিসি, ট্রাফিক ডিসি, পাঁচ থানার ওসি এবং পাঁচ থানার বিএনপি নেতাদের নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত একবার আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠক করা হতো। কিন্তু ঘুন্টিঘরের সুরাহা না হওয়ায় স্থানীয়দের নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। থানাকে আগে থেকেই জানিয়ে ভলান্টিয়ারদের বিভিন্ন পয়েন্টে সেট করে তাঁরা সেখানে প্রবেশ করেন। ঘুন্টিঘরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মাচার ভিতর থেকে ২৫-৩০ লোক দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং একদল লোক গাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। সেই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি নিজের লাইসেন্সকৃত ব্যক্তিগত অস্ত্র হাতে নেন। ইশরাক জানান, তাঁর দুটি বৈধ লাইসেন্সকৃত অস্ত্র রয়েছে—একটি পয়েন্ট থ্রি-টু বোরের পিস্তল এবং অন্যটি রাইফেল।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অস্ত্র পকেটে ঢুকিয়ে নেন। ইশরাক জানান, এরপর প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে হেঁটে তাঁরা বেশ কিছু স্পটে তল্লাশি চালান। এ সময় প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ, দেশীয় অস্ত্র, চাপাতি এবং অনেক মোবাইল ফোন উদ্ধার করেন। ঘটনাস্থল থেকে ছয় মাদকসেবীকে আটক করে আলামতসহ পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়। অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, আইন কি এই অনুমোদন দেয়‘ইশরাকের অ্যাকশন’। স্ট্রিম গ্রাফিক
সংবাদমাধ্যমে ঘটনার উপস্থাপনের সমালোচনা করেন সদ্য সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রাত্রে জানতে পারি অভিযানের ভিডিও গণমাধ্যমে দেখানো হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের হেডলাইন দেওয়া হয়েছে। এটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আমার দলকে বিব্রত করেছে। অভিযানের মূল উদ্দেশ্য মাদককে নির্মূল করতে চাওয়াকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
ইশরাক বলেন, আমার প্রত্যাশা ছিল গণমাধ্যম এই উদ্যোগে সাহস জোগাবে ও অনুপ্রেরণা দেবে, কিন্তু তা না করে ‘অস্ত্র, ইশরাক’ বা ‘প্রতিমন্ত্রী, অস্ত্র’ এমনভাবে কিওয়ার্ড তৈরি করে মূল উদ্দেশ্য ধ্বংস করা হয়েছে।
ইশরাক হোসেন জানান, তাঁর বাবা বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে এই স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও সাংস্কৃতিক যুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং মাদকবিরোধী যুদ্ধ আজীবন চালিয়ে যেতে হবে।
ইশরাক আরও জানান, পদত্যাগ করলেও মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে তিনি পিছু হটবেন না। নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-৬ আসন এবং বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর মাদক নির্মূল ও স্থানীয় জনগণের সমস্যা সমাধানে মাঠে থাকবেন।
ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, ‘এলাকা ঠিক করো, এলাকায় কাজ করো।’ তাঁর এই নির্দেশনা ও এলাকার মানুষের সমর্থন নিয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ ছাড়াই মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে গিয়ে নিজের লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে বিতর্কের সূচনা করেন ইশরাক হোসেন। এই ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। গতকাল রোববার রাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো গুঞ্জন ওঠে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।


