গাংনী অফিস:
মেহেরপুরের গাংনীতে গবাদিপশুর মাংস কাটতে গিয়ে হাতে ছোট্ট একটি ফুসকুড়ি দেখা দিয়েছিল পলি খাতুনের। প্রথমে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি তিনি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে ফুসকুড়িটি বড় হয়ে হাতে শুরু হয় জ্বালা ও যন্ত্রণা। পরে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জানতে পারেন, তিনি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হলেও অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস নাড়াচাড়া করার সেই অভিজ্ঞতা তাকে আতঙ্কিত করে তুলেছে।
শুধু পলি খাতুন নন, গাংনীতে অসুস্থ গবাদিপশু জবাই, মাংস কাটা ও নাড়াচাড়ার পর মানুষের অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ৪১৮ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের বেশির ভাগই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ নতুন নয়। গত এক যুগের বেশি সময় ধরে প্রতিবছরই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ২০১৩ সালে ১৯৯ জন, ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯৩, ২০২৪ সালে ৬৮৬ এবং ২০২৫ সালে ৬৩৭ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
চর গোয়াল গ্রামের সেলিনা খাতুনের হাতে ছাগলের মাংস কাটার পর ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তিনি বলেন, ছাগলের মাংস কিনে বাড়িতে আনার পর তার হাতে ঘামাচির মতো একটি ফুসকুড়ি ওঠে। প্রথমে চুলকানি থাকলেও পরে সেটি বড় হতে থাকে। এখন সেখানে প্রচণ্ড জ্বালা ও যন্ত্রণা হচ্ছে। আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিত ওষুধ কিনে চিকিৎসা করানোও তার জন্য কষ্টকর। বাওট গ্রামের আনিসুর রহমান ছাগলের ব্যবসা করেন। তার ভাষ্য, একটি ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি সেটি জবাই করে বাজারে বিক্রি করেন। পরে বাজার থেকে গরুর মাংস কিনে এনে খাওয়ার পর তার হাতে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে সেটি বড় হয়ে যায় এবং হাতে জ্বালা ও যন্ত্রণা শুরু হয়। একই গ্রামের পলি খাতুন বলেন, গরুর মাংস পরিষ্কার করে রান্না করার পর তার ডান হাতে ছোট একটি ফোঁড়া হয়। পরে সেটি বড় হতে থাকে এবং হাতে জ্বালা ও যন্ত্রণা শুরু হয়। এরপর তিনি গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গবাদিপশুকে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত টিকা দেয়া না হওয়ায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। মোমিনপুর গ্রামের রুহুল আমিন বলেন, গবাদিপশুর মধ্যে রোগের বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিত টিকাদান জরুরি। অসুস্থ বা মৃত গবাদিপশু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হলে মাংস কাটাকাটি ও নাড়াচাড়ার সময় মানুষের শরীরেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। রায়পুর গ্রামের আব্দুল আলিমের দাবি, গবাদিপশুর টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি হাট-বাজারে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। অসুস্থ গরু যেন বাজারে বিক্রি কিংবা জবাই করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সচেতন নাগরিক মজিবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে অসুস্থ গরু বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এসব গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হলে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। আরেক বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন বলেন, গবাদিপশুকে ঠিকমতো টিকা না দেওয়ার কারণে পশুর মধ্যে রোগ বাড়ছে। পরে সেই পশুর সংস্পর্শে এসে মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। এ জন্য নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা দরকার। গাংনী পৌর এলাকার আব্দুলের অভিযোগ, রাতের আঁধারে অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস বিক্রি করা হচ্ছে। এতে মাংস কাটছেন বা নাড়াচাড়া করছেনÑএমন মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। প্রশাসনের বাজার নজরদারি বাড়িয়ে এ ধরনের জবাই বন্ধ করা উচিত।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. মাসুদুর রহমান বলেন, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪১৮ জন অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্ত রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এবং সরকারিভাবে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি অসুস্থ গবাদিপশুর মাংস কাটা, নাড়াচাড়া কিংবা সংস্পর্শে না আসার বিষয়ে রোগীদের সচেতন করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম বলেন, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে চলতি বছর ৩০ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার গবাদিপশুকে টিকা দেয়া হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও টিকার সংকট থাকায় শতভাগ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের এ বক্তব্যে স্থানীয়দের অভিযোগেরও কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কারণ, একদিকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে রোগ প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান ব্যবস্থা টিকাদানেই রয়েছে ঘাটতি।
গাংনীতে দীর্ঘদিন ধরে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ থাকলেও আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং কোনো কোনো বছরে তা বেড়েছে। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯৩ জনে পৌঁছানো এর বড় উদাহরণ। চলতি বছরের নয় মাসেই ৪১৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিলেই হবে না, রোগের উৎসেও নজর দিতে হবে। অসুস্থ গবাদিপশু জবাই বন্ধ করা, মৃত পশু নিরাপদভাবে অপসারণ, হাট-বাজারে পশু পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানো, গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকার আওতায় আনা এবং মাংস কাটাকাটি ও নাড়াচাড়ার সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয়দের দাবি, অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করা হোক। কারণ, অসুস্থ পশুর মাংস মানুষের ঘরে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা দেয়ার চেয়ে পশুটিকে আগেই শনাক্ত করে জবাই ও মাংস বিক্রি বন্ধ করাই সংক্রমণ ঠেকানোর কার্যকর পথ। গাংনীর মানুষের প্রত্যাশা, বছরের পর বছর ধরে চলা অ্যানথ্রাক্সের এই ঝুঁকি থেকে মুক্তি পেতে এবার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় আরও জোর দেয়া হবে।


