জীবননগর অফিস:
জীবননগরে ঢোলের তালে তালে বেজে উঠল লাঠির ঝনঝনানি। সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ হুঙ্কার, কাঁসার শব্দ আর লাঠিয়ালদের ক্ষিপ্র আক্রমণ-প্রতিরোধ। মুহূর্তেই যেন ফিরে এল গ্রামীণ বাংলার সেই পুরোনো দিনের আবহ। বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা দেখতে ভিড় জমালেন শত শত মানুষ। লাঠিয়ালদের দুর্দান্ত কসরত ও নিখুঁত আত্মরক্ষার কৌশলে মুগ্ধ হয়ে হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো মাঠ। গতকাল শনিবার দুপুরে জীবননগর পশু হাসপাতালের সামনের খোলা মাঠে এ ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলার আয়োজন করা হয়। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পুরন্দপুর লাঠিয়াল বাহিনী এ আয়োজন করে।
দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খেলার মাঠের চারপাশে দর্শকের ভিড় বাড়তে থাকে। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ এসে জড়ো হন। কারও চোখে কৌতূহল, কারও মুখে বিস্ময়। আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই প্রাচীন খেলা দেখতে অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঠে আসেন। খেলা শুরু হতেই বদলে যায় পুরো পরিবেশ। ঢোলের তালে তালে লাঠিয়ালদের পদচারণা, লাঠির সঙ্গে লাঠির সংঘর্ষের ঝনঝন শব্দ আর ক্ষিপ্র কসরতে দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। কখনো একে অপরকে আক্রমণের ভঙ্গিতে এগিয়ে যাওয়া, আবার মুহূর্তের মধ্যে নিখুঁত কৌশলে প্রতিপক্ষের আঘাত ঠেকিয়ে দেওয়াÑলাঠিয়ালদের এমন সব নৈপুণ্য দেখে মুগ্ধ হন দর্শকেরা। পুরন্দপুর লাঠিয়াল বাহিনীর দলনেতা ও বীর লাঠিয়াল রোওশনের নেতৃত্বে খেলায় অংশ নেন লাঠিয়াল জালাল, শাহাজান, কাগু ও আলম। তাদের সমন্বিত কসরত ও দক্ষতায় পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। লাঠিয়ালদের একেকটি কসরতের সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের মধ্য থেকে ভেসে আসে হাততালি ও উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে দ্রুতগতির আক্রমণ ও আত্মরক্ষার কৌশল প্রদর্শনের সময় দর্শকদের মধ্যে বাড়তে থাকে উত্তেজনা। মাঠের চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশু-কিশোরদের চোখে ছিল বিশেষ আগ্রহ। অনেকেই মোবাইল ফোনে খেলার দৃশ্য ধারণ করেন।
দর্শনার্থীরা বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিনোদনের ধরন বদলে গেছে। প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের কারণে গ্রামীণ বাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। আগে বিভিন্ন গ্রাম ও হাট-বাজারের মেলা, উৎসব কিংবা বিশেষ আয়োজনে নিয়মিত লাঠি খেলা দেখা গেলেও এখন এমন আয়োজন খুব একটা চোখে পড়ে না। জীবননগরে দীর্ঘদিন পর এমন আয়োজন দেখতে পেরে তারা আনন্দিত। তাদের মতে, শুধু বিনোদনের জন্য নয়, নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় এক দর্শনার্থী বলেন, ছোটবেলায় লাঠি খেলা দেখেছি। এখন এসব খেলা প্রায় দেখাই যায় না। আজকের আয়োজন দেখে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেল। শিশু-কিশোরদেরও এ ধরনের খেলা দেখানো দরকার, যাতে তারা আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।
পুরন্দপুর লাঠিয়াল বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, লাঠি খেলা শুধু একটি বিনোদন নয়, এটি বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং হারিয়ে যেতে বসা এই খেলাকে টিকিয়ে রাখতেই এমন আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা পেলে লাঠি খেলাকে আবারও গ্রামীণ জনপদের নিয়মিত সাংস্কৃতিক আয়োজনের অংশ করে তোলা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন বিলুপ্তপ্রায় লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মও পরিচিত হবে তাদের শেকড়ের সঙ্গে।

আলমডাঙ্গায় লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত: ছবি খাসখবর
আলমডাঙ্গা অফিস জানিয়েছেন: ঢোলের তালে মুহুর্মুহু লাঠির আঘাত, পাল্টা প্রতিরোধের খটাখট শব্দ। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। এমনই প্রাণবন্ত পরিবেশে আলমডাঙ্গায় অনুষ্ঠিত হলো গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। শ্রাবণ মাসের প্রথমে এই লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আলমডাঙ্গা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এরশাদপুর গ্রামের বাসিন্দারা এ আয়োজন করেন। গতকাল শনিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্রামের বিভিন্ন মহল্লায় লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত হয়। খেলা দেখতে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
লাঠিখেলার পাশাপাশি পানি ভর্তি কলস নিয়ে চেয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নাচের পরিবেশনাও ছিল দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। এসব পরিবেশনা ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। খেলা দেখতে আসা আসাবুল হোসেন বলেন, আধুনিক সময়ে এ ধরনের গ্রামীণ খেলাধুলা হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মের বড় একটি অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে বেশি সময় কাটায়। তাই গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া প্রয়োজন। খেলা দেখে তিনি আনন্দ পেয়েছেন।
লাঠিয়াল আলফাজ উদ্দীন বলেন, দেশীয় অনেক খেলাধুলা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় গ্রামগঞ্জে নিয়মিত লাঠিখেলার আয়োজন হতো। তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিভিন্ন জায়গায় চুক্তিতে লাঠিখেলা দেখাতেন। এখন আগের মতো আয়োজন হয় না। এ ধরনের লোকজ খেলাকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত আয়োজন করা দরকার।


