অসুস্থ মানুষ সুস্থ হওয়ার আশায় ওষুধ কেনেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ও ফার্মেসির ওপর আস্থা রেখেই মানুষ ওষুধ সেবন করেন। কিন্তু সেই ওষুধ যদি হয় মেয়াদোত্তীর্ণ, অনিবন্ধিত কিংবা ফিজিশিয়ান স্যাম্পল, তাহলে চিকিৎসার বদলে তা হয়ে উঠতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। আরও উদ্বেগের বিষয়, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। চুয়াডাঙ্গায় সাম্প্রতিক এক অভিযানে এমনই বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে, যা জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। গত সোমবার চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার একাডেমি মোড় ও পূর্ব কমলাপুর এবং আলমডাঙ্গার বিভিন্ন ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিবন্ধিত ওষুধ মজুত ও বিক্রির অভিযোগে চারটি ফার্মেসিকে মোট ৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে অনিবন্ধিত ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। ‘ঔষধ ও কসমেটিকস্ আইন-২০২৩’-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় চারটি মামলা হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্ন হলোÑএ ধরনের অভিযান কি কেবল জরিমানা ও মামলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ওষুধের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এটি ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হবে? এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপজ্জনক। প্রয়োজন ছাড়া কিংবা ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করলে জীবাণুর মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তখন সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়বে। একজন রোগী হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা সুস্থ বোধ করবেন কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ক্ষতি হতে পারে অনেক বেশি। তাই প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি রোগী ও বিক্রেতাÑউভয় পক্ষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির বিষয়টিও কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। একটি ওষুধের নির্ধারিত মেয়াদ পার হওয়ার পর তার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা রোগীর জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। অথচ ফার্মেসির তাকেই যদি এমন ওষুধ পড়ে থাকে এবং তা বিক্রির জন্য রাখা হয়, তাহলে সেটি নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়Ñএটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। একইভাবে অনিবন্ধিত ওষুধ এবং ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বাজারে বিক্রির বিষয়টিও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। কোনো ওষুধের মান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, উপাদান ও সংরক্ষণব্যবস্থা সম্পর্কে যথাযথ নিশ্চয়তা না থাকলে সেটি রোগীর হাতে তুলে দেয়া বিপজ্জনক। ফিজিশিয়ান স্যাম্পল চিকিৎসকদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত, সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির সুযোগ থাকা উচিত নয়। ফলে ফার্মেসিতে কোন ওষুধ কীভাবে এসেছে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং কার কাছে বিক্রি হচ্ছেÑএসব বিষয় নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে হবে। চুয়াডাঙ্গার সাম্প্রতিক অভিযান অবশ্যই স্বাগতযোগ্য। ঔষধ প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিচালিত এই ধরনের মোবাইল কোর্ট অনিয়মকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি করবে। তবে কেবল মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ একটি ফার্মেসিতে জরিমানা করার পর অন্য কোথাও একই অনিয়ম চলতে থাকলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল লক্ষ্য পূরণ হবে না। এজন্য জেলার সব ফার্মেসিতে নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স ও নিবন্ধন যাচাই, ওষুধের মেয়াদ পরীক্ষা, সংরক্ষণব্যবস্থা তদারকি এবং প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধ বিক্রির নিয়ম কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানকে শুধু অর্থদণ্ড নয়, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। ফার্মেসি মালিক ও বিক্রেতাদেরও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রির আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না কেনা, মেয়াদ ও নিবন্ধন যাচাই করা এবং সন্দেহজনক ওষুধ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোÑএসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কারণ নিরাপদ ওষুধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়, চিকিৎসক, ফার্মেসি মালিক, ওষুধ বিক্রেতা এবং ভোক্তাÑসবার। চুয়াডাঙ্গায় চারটি ফার্মেসিকে ৯ হাজার টাকা জরিমানা হয়তো একটি ছোট অঙ্ক। কিন্তু এই অভিযানের বার্তা বড়Ñওষুধের ব্যবসায় মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ছেলেখেলা চলতে পারে না। অভিযান যদি নিয়মিত হয়, আইন যদি নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়, তাহলে ওষুধের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে তাই অনিয়মের বিরুদ্ধে এই তৎপরতা থামানো নয়, বরং আরও বিস্তৃত ও ধারাবাহিক করা এখন সময়ের দাবি।


