আজ ,,
,

শিরোনামঃ
📰‘নজরুলের সাম্য ও মানবতার দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে’📰দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ রুটে ট্রেন চালুর দাবি লোকমোর্চার📰অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি ও নিয়োগপত্র জালিয়াতি, অভিযুক্ত শাহজামাল গ্রেপ্তার📰দামুড়হুদায় ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত যুবকের গলা-ঘাড়ে কোপ, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ📰আলমডাঙ্গায় কারেন্ট ও চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস📰চুয়াডাঙ্গায় নজরুল উৎসবে আবৃত্তি-নাটকে মুগ্ধ দর্শক📰জীবননগরে মনোহরপুরে ভৈরব নদের পাড়ে ২ হাজার গাছ কর্তন📰বিএনপি নেতা হত্যা মামলায় আলমডাঙ্গার সাবেক ওসি বিপ্লব গ্রেপ্তার📰দামুড়হুদার নাটুদহে লংমার্চ উপলক্ষে জামায়াতের আলোচনা📰মাথাভাঙার ভাঙনে আতঙ্কে নগরবোয়ালিয়ার ১৫ পরিবার
হোম পেজজাতীয়ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তোলপাড়

ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পর দেশজুড়ে তোলপাড়




ঢাকা অফিস:

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের একটি বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘ক্রসফায়ার’। অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ক্রসফায়ার করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এই বক্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে, ফের কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিতর্ক ফিরছে?আইজিপির বক্তব্য সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে অপরাধ দমনে ক্রসফায়ারের প্রসঙ্গ কেন সামনে আনা হলো? এটি কি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা, নাকি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ও বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে আসা?
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে ক্রসফায়ারের মতো ঘটনার কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে যে কোনো সরকারের শিক্ষা নেওয়া উচিত। ক্রসফায়ারকে অনুমোদন দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সরকারের বাইরে আরেকটি কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে তারা নিজেরাই আইন প্রয়োগ করতে শুরু করে। কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হলে তা অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে। আইজিপির এমন বক্তব্যে বিব্রত হবে সরকার।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ক্রসফায়ার বিষয়ে আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে। টিআইবি বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ব্যবহারের অপরিণামদর্শী ও বিপজ্জনক বার্তা। আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, বক্তব্য প্রত্যাহার এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। প্রায় দুই যুগ ধরে বাংলাদেশের পরিচিত শব্দ ক্রসফায়ারের উৎস খুঁজতে গেলে ফিরতে হবে ২০০১-২০০৬ সালের দিকে। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার শর্টকাট হিসেবে শুরু হয়েছিল ‘ক্রসফায়ার’। গঠন করা হয় বিশেষ বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। সেই আমলে ক্রসফায়ার ও র‌্যাবের সমালোচনায় মুখর ছিল তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করার কথাও বলেছিল। তবে টানা ক্ষমতার সাড়ে ১৫ বছর এই ধারা অব্যাহত রাখে আওয়ামী লীগও। ক্রসফায়ারের পাশাপাশি শুরু হয় গুম, যা ছিল আরও ভয়ের।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমের বিষয়টি আলোচনায় আসে। একে একে বেরোতে থাকে গোপন বন্দিশালাগুলোর ভয়ঙ্কর তথ্য। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচার ও গুমবিরোধী আইন করার উদ্যোগ নেয়। বর্তমান বিএনপি সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬ করেছে। আইনে গুমের সংজ্ঞা, অপরাধের ধরন, শাস্তি ও তদন্তের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেভাবে শুরু ক্রসফায়ার: ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের দিনে নতুন একটি বাহিনী হিসেবে ‘র‌্যাব’ গঠন করা হয়। তিন মাস পেরোতে না পেরোতেই কাজ দেখাতে শুরু করে র‌্যাব। ওই বছরের ২৬ জুন র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর প্রাণ হারান কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তের কর্মী দেবাশীষ দাস (৩০)। ঘটনাটি নিয়ে র‌্যাবের ভাষ্য ছিল- শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানকে গ্রেফতার করতে গেলে তার সহযোগীদের সঙ্গে গুলিবিনিময় হয়, এ সময় ডান পায়ে গুলিবিদ্ধ হন দেবাশীষ। তবে পরিবারের বরাত দিয়ে ২৭ জুনের ভোরের কাগজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদের সময় র‌্যাব সদস্যরা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। একদিন পরই অর্থাৎ, ২৭ জুন পিচ্চি হান্নানের সহযোগী সন্দেহে গ্রেফতার হওয়া ইকবাল হোসেন ওরফে নিটল বাবু নিহত হন। র‌্যাবের ভাষ্য ছিল- পিচ্চি হান্নানকে গ্রেফতারের চেষ্টার সময় গুলিবিনিময়ে আহত হন বাবু। তবে ইকবালের পরিবারেরও দেবাশীষের পরিবারের মতো নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ ছিল। এরপর আরও দুটি একই রকম ঘটনা। ১৫ জুলাই র‌্যাবের হাতে নিহত হয় টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার প্রধান সাক্ষী সুমন মজুমদার।
র‌্যাব নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা কিংবা সমালোচনা, তখন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা র‌্যাব সদস্যদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ১৮-২০টি করে মামলা রয়েছে। ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া আল্লাহরই বিচারে হচ্ছে। র‌্যাব ভালো কাজ করছে, সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। ক্রসফায়ারে নিরীহ কেউ মারা গেলে অ্যাক্সিডেন্ট বলতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। (দৈনিক সংবাদ, ২৭ অক্টোবর ২০০৪)। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জাতীয় সংসদে বলেন, সন্ত্রাস দমনে র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও কিছু বেসরকারি সংগঠন। র‌্যাব কোনো নিরীহ মানুষ হত্যা করেনি। র‌্যাব প্রয়োজনে আরও কঠোর হবে। বাংলাদেশে কোনো সন্ত্রাস থাকবে না। (দৈনিক যুগান্তর, ৩ ডিসেম্বর ২০০৪)।
আওয়ামী লীগ আমলের ক্রসফায়ার: ২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের ওয়াদা করেছিল আওয়ামী লীগ। যদিও ক্ষমতায় এসে ক্রসফায়ারের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা-গ্রেফতারের নতুন নতুন কৌশল যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ক্রসফায়ার বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মানবাধিকার আলোচনার অন্যতম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তবে বিভিন্ন ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মী ও অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, কিছু ঘটনা ছিল পরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকলেও তার অপরাধ নির্ধারণ ও শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আদালতের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অপরাধীকে গ্রেফতার করা, প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং আইনের আওতায় আনা, বিচারের বাইরে শাস্তি দেওয়া নয়। গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ যখন সুনির্দিষ্টভাবেই উঠছিল, তখন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিভিন্ন সভা-সেমিনার বা সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন তারা কেউ গুম হয়নি, এরা পলাতক।
পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরের ক্রসফায়ারের তথ্য সংরক্ষণ করেছে। এতে দেখা যায়, এই সাত বছরেই ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ১ হাজার ২৯৩ জন। এসবির হিসাবে সাত বছরে ক্রসফায়ারে নিহতের যে সংখ্যা বলা হয়েছে, আসকের হিসাবে সেই সংখ্যা আরও ১২০ জন বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নিয়ে এসবির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নিহতদের নামের পাশে পরিচয়ের ঘর রয়েছে। তাতে নিহত ব্যক্তিদের ২৩ ধরনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীও রয়েছেন। তবে বেশিরভাগ নামের পাশে ‘সন্ত্রাসী’, ‘দুষ্কৃতকারী’, ‘বন্দুকধারী’ বা ‘অস্ত্রধারী’, ‘মাদক কারবারি’, ‘জলদস্যু’, ‘বনদস্যু’, ‘ডাকাত’, ‘ছিনতাইকারী’, ‘মামলার আসামি’, ‘চরমপন্থি’ ইত্যাদি পরিচয় দেওয়া হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক কর্মীকেও এসব পরিচয়ে ক্রসফায়ারে মারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ক্রসফায়ারে নিহত ৪৭৭ জনের পরিচয় লেখা হয়েছে মাদক ব্যবসায়ী বা মাদক কারবারি। এরপর সবচেয়ে বেশিজনের (৩০০ জন) পরিচয়ের ঘরে লেখা হয়েছে ডাকাত, রোহিঙ্গা ডাকাত ও ছিনতাইকারী। নিহত ১৪২ জনের পরিচয় ‘সন্ত্রাসী’ লেখা। এতে পাঁচজনকে বিএনপি ও অন্য সংগঠনের সদস্য এবং ৯ জনকে জামায়াত-শিবিরের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে তালিকায় ২০১৭ সালের পর থেকে নিহত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় আর উল্লেখ করেনি এসবি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫২ জনের কোনো পরিচয় ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত পুলিশের নথিতে উল্লেখ করা হয়নি।
ক্রসফায়ারের পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয় চট্টগ্রাম বিভাগে, যা আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রসফায়ার দেওয়া হয় ঢাকা বিভাগে, এখানে নিহত হন ২৯১ জন। এরপরই রয়েছে খুলনা, সেখানে নিহত হন ২৬০ জন। এর বাইরে রাজশাহী বিভাগে ১১৬ জন, বরিশাল বিভাগে ২৯ জন, সিলেট বিভাগে ৩৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৮ জন ও রংপুর বিভাগে ৪৭ জনকে বিচার ছাড়াই গুলি করে হত্যা করা হয়।
জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্রসফায়ারের ঘটনা কক্সবাজারে। সাত বছরে (২০১৫-২১) এই জেলায় ২২৬ জন নিহত হন পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের ক্রসফায়ারে। জেলা হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্রসফায়ারে ঘটনা ঢাকায়; এখানে নিহত ১৫১ জন। তৃতীয় সর্বোচ্চ চট্টগ্রামে ৭০ জন।
বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে আইজিপির বক্তব্য ক্রসফায়ার নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবারও সামনে এনেছে। তবে এই বক্তব্য থেকেই সরকার ক্রসফায়ার চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা নতুন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হবে কি না- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আইজিপির বক্তব্যে সরকার অনুমোদন দেয়ার শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- সরকার এ বক্তব্যের বিষয়ে কী অবস্থান নেয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হবে। অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো ও সদস্যদের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি এক বিষয়। অন্যদিকে, বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কাকে অপরাধ দমনের পদ্ধতি হিসেবে আলোচনায় আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানায়, সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনা সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না। তার মতে, আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার বিকল্প হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে সামনে আনা পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত। পুলিশের দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। ক্রসফায়ার এ দায়িত্ব পালনের বিকল্প হতে পারে না।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এ দুটি অবস্থান পরস্পরবিরোধী। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই। আইজিপির বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে টিআইবি। বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া, বক্তব্য প্রত্যাহার এবং তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সশস্ত্র অপরাধের ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। অপরাধীরা যেন দ্রুত গ্রেফতার হন এবং মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রসফায়ারকে সমাধান হিসেবে সামনে আনা হলে প্রশ্ন থাকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে তার দায় কে নেবে? নিরপরাধ কেউ নিহত হলে প্রতিকার কী হবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাকে কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে?
এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘ক্রসফায়ার পুলিশ রেগুলেশনে নেই, আইনে নেই, কোনো কিছুর মধ্যেই নেই। ক্রসফায়ার বলতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি বোঝায়। সরকার কি দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি সাজিয়ে দেবে? এ ধরনের বক্তব্য অনেক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করবে এবং এটি বেআইনি কাজ হবে।’ মানবাধিকার লঙ্ঘন হওয়ার ঝুঁকি থাকে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ধরে এনে গুলি করে হত্যা করা হলে তা অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে।’
আইজিপির ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, ‘ক্রসফায়ার আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে অপরাধ কমেছে, এমন কোনো পরিসংখ্যান কেউ দেখাতে পারবেন না। অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ তিনি বলেন, ‘সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ক্রসফায়ার বন্ধের বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে। এ অবস্থায় আইজিপির এমন বক্তব্য জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। এ বক্তব্যে সরকার বিব্রত হবে, এটাই স্বাভাবিক। জনগণও বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছে।’
পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, পুলিশ রাষ্ট্রের বাহিনী, সরকারের বাহিনী নয়। তাদের রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হবে। পুলিশ সরকারের পক্ষে কাজ করবে-এমন ধারণা জনগণের কাছে ভুল বার্তা দিতে পারে। সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকে ক্রসফায়ার সমর্থনযোগ্য নয়।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘ক্রসফায়ার একটি ভিন্ন বিষয়। প্রয়োজন হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী শক্তি প্রয়োগ করতে পারে, কিন্তু কাউকে দূরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অতীতে এসব ঘটনার কারণে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে যে কোনো সরকারের শিক্ষা নেওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘ক্রসফায়ারকে অনুমোদন দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সরকারের বাইরে আরেকটি কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে তারা নিজেরাই আইন প্রয়োগ করতে শুরু করে। তৎকালীন র‌্যাবের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকেও আমাদের যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া উচিত। আইজিপি তার বক্তব্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার না করলেই পারতেন। তবে তার বক্তব্যের বাকি অংশের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।’
ক্রসফায়ার নিয়ে বক্তব্যের পর এ বিষয়ে সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে পুলিশ সদর দপ্তর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেয়। সেখানে বলা হয়, আইজিপি তার বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ক্রসফায়ার শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে ক্রসফায়ার শব্দটি উল্লেখ করেননি।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

- Advertisment -
Google search engine

সর্বশেষ সংবাদ