আলমডাঙ্গা থেকে তানভির সোহেল:
আলমডাঙ্গা পৌরসভার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ১৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হলেও কাজ শুরু হয়নি। কাজ শুরুর নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১০ মাস পেরিয়ে গেছে। সর্বনিম্ন দরদাতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষর না করায় প্রকল্পটি আটকে যায়। পরে দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আইনগত জটিলতায় সেটিও দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এখন দ্রুত আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। আলমডাঙ্গা পৌরসভার নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) তৃতীয় ধাপের আওতায় প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এর প্যাকেজ নম্বর ওটএওচ/অখঅগ/টঞ+উজ/০৩/২০২৩ এবং টেন্ডার আইডি ১১৪৫৭২৬। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ১৬ কোটি ৫৯ লাখ ৯১ হাজার ১৬৫ টাকা।
পৌরসভা কার্যালয়ের টেন্ডার রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রকল্পের দরপত্রে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে উঈখ ্ গঞ (ঔঠ) সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি ১৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬০০ টাকা দর দেয়। এরপর ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (ঘঙঅ) দেওয়া হয়। টেন্ডার রিপোর্টে বলা হয়েছে, চুক্তি সম্পাদনের আগে ঠিকাদারকে ৬৮ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩০ টাকা পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা জমা না দেয়ায় চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। পরে ঠিকাদার সময় বাড়ানোর আবেদন করেন। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ আইনগত প্রতিকার চেয়ে ‘নোটিশ ফর ডিমান্ডিং জাস্টিস’ দেয়া হয়। এর পর থেকে ওই দরপত্রের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার ১৪টি স্থানে ডিবিসি ও আরসিসির মাধ্যমে মোট ৮ হাজার ৯৫৯ মিটার সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়ন করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া দুটি ক্রস-ড্রেন, ৪৯৪ মিটার পালসাডিং, ২৭৮টি স্ট্রিটলাইট এবং পাঁচটি স্থানে আরসিসির মাধ্যমে ১ হাজার ১৯৭ মিটার ড্রেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পৌরসভার চলমান নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প প্রাক্কলন নথিতে থাকা ১০টি কাজের মোট নেট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ২৬ হাজার টাকা। এর মধ্যে এরশাদপুর নতুন বাজার থেকে এরশাদপুর একাডেমি স্কুল পর্যন্ত ৬৫২ মিটার ডিবিসি সড়ক ও ২৩টি স্ট্রিটলাইটের জন্য প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯০ লাখ ১১ হাজার ৮২০ টাকা। এরশাদপুর চাতাল মোড় থেকে সবেদ আলী চেয়ারম্যানের বাড়ি পর্যন্ত ৮৭২ মিটার সড়ক, একটি ক্রস-ড্রেন ও ৩১টি স্ট্রিটলাইটের জন্য প্রাক্কলন ১ কোটি ৪ লাখ ২৬ হাজার ৪৪৪ টাকা। এরশাদপুর ঈদগাহ থেকে আলমের বাগান পর্যন্ত ৪২৮ মিটার সড়ক ও ছয়টি স্ট্রিটলাইটের জন্য ৪২ লাখ ৪২ হাজার ৩০৮ টাকা। আনন্দধাম ব্রিজ থেকে এরশাদপুর নতুন বাজার ও সংযোগ সড়কের মোট ১ হাজার ৩৬৪ মিটার উন্নয়ন, একটি ক্রস-ড্রেন ও ৪৬টি স্ট্রিটলাইটের জন্য প্রাক্কলন ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪ হাজার ৮৫২ টাকা। গোবিন্দপুর মাঠপাড়া থেকে নাজিম ইসলামের দোকান পর্যন্ত ১৬৬ মিটার সড়ক ও ছয়টি স্ট্রিটলাইটের জন্য ৫০ লাখ ২১ হাজার ৬৬৮ টাকা। চারতলা সত্যনারায়ণ মন্দির থেকে একাত্তর চত্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪১১ মিটার সড়ক ও ৫০টি স্ট্রিটলাইটের জন্য প্রাক্কলন ২ কোটি ৬৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫৯ টাকা। কাচারি বাজার থেকে শুরু হওয়া ৩৭০ মিটার আরসিসি সড়ক ও ১৩টি স্ট্রিটলাইটের জন্য ২৬ লাখ ১১ হাজার ৩১৪ টাকা। চাতাল মোড় থেকে হাইরোড এবং লোকমান ক্লিনিকের সামনে থেকে রাজ্জাকের দোকান পর্যন্ত ১ হাজার ১৩৮ মিটার আরসিসি সড়ক ও ৩০টি স্ট্রিটলাইটের জন্য ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩১ টাকা। বন্ডবিল ঈদগাহপাড়া থেকে জিকে খাল পর্যন্ত ৩১৬ মিটার সড়ক ও ১১টি স্ট্রিটলাইটের জন্য ৩৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩৮ টাকা এবং গোবিন্দপুর হরিতলা থেকে গোবিন্দপুর হরি বাড়ি পর্যন্ত ১২৬ মিটার সড়ক ও পাঁচটি স্ট্রিটলাইটের জন্য ১৫ লাখ ১২ হাজার ২৮০ টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে।
আলমডাঙ্গা পৌরসভার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখের ই-টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ছিল ওই বছরের ২১ অক্টোবর বিকেল চারটা এবং দরপত্র খোলার সময় ছিল ২২ অক্টোবর দুপুর একটায়। টেন্ডার পাওয়ার পর কাজ শুরুর সম্ভাব্য তারিখ ধরা হয়েছিল ১ ডিসেম্বর ২০২৫। কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৭। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ঠিকাদার চুক্তি না করায় পৌরসভা নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র বাতিলের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ঠিকাদারের দেওয়া আইনগত নোটিশের কারণে পরবর্তী কার্যক্রম আটকে যায়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই নোটিশের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতে কোনো রিট হয়নি। ফলে আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানে বর্তমানে আইনগত বাধা নেই। পৌরসভার মামলার পরামর্শক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাজেদুর রহমান প্রকল্পসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করেছেন। তার পরামর্শে আগের দরপত্র বাতিল করে পুনঃদরপত্র আহ্বানে আইনগত বাধা নেই বলে মত দেওয়া হয়েছে। আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে তারা জানান।
আলমডাঙ্গা পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বলেন, প্রকল্পটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। পৌরসভার সচিব রাকিবুল ইসলাম বলেন, পুনঃদরপত্র আহ্বানের কাজ গোপনীয়ভাবে চলছে। আগামী ২৮ তারিখে নগর সমন্বয় কমিটির সভা করে সেই সভার সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী খুব দ্রুতই বিষয়টির সমাধানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পৌরসভার আলোচ্য উন্নয়নমূলক কাজ শুরু হলে নাগরিকদের দুর্ভোগ কমবে।


