মেহেরপুর অফিস:
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, বাংলাদেশ জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর দেশ। দেশের নিজস্বভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদন নেই। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে তেল আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও বীমার প্রিমিয়ামও বেড়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও দ্রুত জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কার্যক্রমসহ সার্বিক সরকারি কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয়বিষয়ক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেও জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন তিনি।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। সরকার প্রায় ছয় মাস পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও বীমা প্রিমিয়াম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কেটে যাবে বলে সরকার আশাবাদী। দায়িত্বশীল রাষ্ট্রগুলোও বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। সংকট কেটে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। তখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে সরকারও দেশের বাজারে দ্রুত দাম সমন্বয়ের চেষ্টা করবে।
মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের সভাপতিত্বে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম, উন্নয়ন সম্ভাবনা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সভায় জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টন, জেলা পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়, বিজিবির চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হাসান, মেহেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এ কে এম নজরুল কবীর এবং মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাজ্জাৎ হাসানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভার কয়েক ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মেহেরপুর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে জেলা বিএনপির আয়োজনে সাংগঠনিক সফর উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সেখানে তিনি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ও বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেন, ‘গুপ্ত ও সুপ্ত’ দুটি সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপির প্রার্থীদের পরাজিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার ভাষ্য, ১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তি এবং ২০২৪ সালের পরাজিত শক্তির মধ্যে ঐক্যের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে সেই ইতিহাস অজানা হলেও বয়োজ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টি জানেন। আশির দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সে সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা তৈরির সময় দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ নানা ঘটনা ঘটেছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালের এরশাদের নির্বাচনে কারা অংশ নিয়েছিল, সেই ইতিহাস সামনে আনলে বর্তমান সময়ের কথিত ‘গুপ্ত ও সুপ্ত’ ঐক্যের পুরোনো প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। তিনি আরও দাবি করেন, পুরোনো সেই রাজনৈতিক ঐক্য নতুন করে সক্রিয় হয়ে বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় নির্বাচনের আগে ও পরে সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বিএনপির প্রতি বিরোধিতার চেয়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর ‘রাগ’ বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বেশি। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী জনগণের ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিএনপির দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে জনগণকে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি এবং ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে করার অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে বিএনপিকে ভোট দেবেÑএমন আশঙ্কা থেকেই দীর্ঘদিন ভোটাধিকার সীমিত রাখার রাজনৈতিক চর্চা করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জনগণ এখন তাদের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সচেতন। কোনো ধরনের অপপ্রচার বা বিভ্রান্তির মাধ্যমে জনগণের মতামতকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। জনগণের ওপর আস্থা রেখেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচিত করায় একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সেই ক্ষোভ থেকেই সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। তাই জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক কর্মীদের জনগণের সেবায় কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদ মিল্টনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের সঞ্চালনায় সভায় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বাবু জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু বক্তব্য দেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ আমজাদ হোসেন। এছাড়া জেলা বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
একই দিনে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় এবং পরে দলীয় সাংগঠনিক সভায় রাজনৈতিক বক্তব্যÑদুটি কর্মসূচিতেই অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। সকালে তার বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও দেশের মূল্য সমন্বয় আর বিকেলের সভায় উঠে আসে নির্বাচন, ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে তার বক্তব্য


