সড়কে নিরাপত্তাহীনতা নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু দিনের আলো ফোটার আগেই যদি একটি জনপদের সড়কে পথরোধ করে অস্ত্রের মুখে মানুষকে জিম্মি করা, মারধর করা, গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা এবং যানবাহন ও টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে তা নিছক একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা। মেহেরপুরের গাংনীতে বামন্দী-দেবীপুর সড়কে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফজরের আজানের পর মাছ ধরতে যাওয়ার পথে কয়েকজন ভ্যানচালককে বাঁশ ফেলে পথরোধ করে একটি দল। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাইকারীদের হাতে ছিল হাসুয়া ও লাঠি। তাদের মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। দুটি পাখি ভ্যান ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়ার পাশাপাশি একজনকে মারধরও করা হয়েছে। পরে একজনের ডাকাডাকিতে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই যে, অপরাধীরা শুধু সম্পদ ছিনিয়ে নেয়নি তারা মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের নিরাপত্তাবোধেও আঘাত করেছে। একজন শ্রমজীবী মানুষ ভোরে জীবিকার প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবেন—এটিই স্বাভাবিক। অথচ সেই সময় সড়কে ওত পেতে থাকা একটি দল তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করবে, মারধর করবে এবং গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখবে—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই একটি নিরাপদ সমাজের চিত্র হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনায় আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ছিনতাইকারীরা যদি দলবদ্ধভাবে সড়কে বাঁশ ফেলে যানবাহন থামিয়ে থাকে, তাহলে ধরে নিতে হয় তারা নির্দিষ্ট কৌশল ও প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। তাদের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল বলেও ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। ফলে এটি আকস্মিক কোনো অপরাধ, নাকি পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের তৎপরতা—তা খুঁজে দেখা জরুরি। একই এলাকায় এর আগে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, আশপাশের সড়কগুলোতে অপরাধীদের চলাচল বা কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা আছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে গেছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে। আমরা এ তৎপরতার দ্রুত ও দৃশ্যমান ফল দেখতে চাই। শুধু মামলা করা বা তদন্ত শুরুর মধ্যে পুলিশের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, আশপাশের মানুষের তথ্য এবং সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সহায়তা কাজে লাগিয়ে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ছিনতাই হওয়া দুটি ভ্যান দ্রুত উদ্ধার করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে ভোরের সময় গুরুত্বপূর্ণ ও নির্জন সড়কগুলোতে পুলিশের টহল বাড়ানো জরুরি। যেসব সড়ক দিয়ে শ্রমজীবী মানুষ ভ্যান, মোটরসাইকেল কিংবা অন্যান্য যানবাহনে চলাচল করেন, সেসব স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি চালানো যেতে পারে। প্রয়োজন হলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমন্বয় করে রাত ও ভোরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব কেবল পুলিশের নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও অপরাধ প্রতিরোধে সচেতন ও সংগঠিত হতে হবে। সন্দেহজনক ব্যক্তির চলাচল, অপরাধীদের আশ্রয় বা ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে কোনো গুজব বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি কিংবা গণপিটুনি দেওয়া যাবে না। অপরাধ দমন করতে গিয়ে যেন আরেক ধরনের অপরাধ তৈরি না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। গাংনীর এ ঘটনা তাই কেবল দুটি ভ্যান ও কিছু টাকা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা নয় এটি মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি সড়কে মানুষ যদি ভোরে বের হয়ে আশঙ্কা করেন—কখন বাঁশ ফেলে পথরোধ করা হবে, কখন অস্ত্রের মুখে জিম্মি হতে হবে—তাহলে সেই সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে। অপরাধীরা যত দ্রুত গ্রেপ্তার হবে, ছিনতাই হওয়া ভ্যান উদ্ধার হবে এবং তদন্তে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে, তত দ্রুত মানুষের আতঙ্ক কমবে। আর যদি এমন ঘটনা তদন্ত ও বিচারের বাইরে থেকে যায়, তাহলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হবে। তাই গাংনীর ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে জননিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। ভোরের সড়ক মানুষের জীবিকার পথ—অপরাধীদের অভয়ারণ্য নয়। মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর, দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।


