ঢাকা অফিস:
রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর এবার দল গোছানোয় পুরোদমে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ থাকা জেলা, মহানগর থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন এবং শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। এর সঙ্গে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতেও জোরালো হচ্ছে নেতৃত্ব বদলের গুঞ্জন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শূন্য পদ পূরণে নতুন কোনো কমিটি না করে বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য থেকেই পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে মৃত্যু, বহিষ্কার, পদত্যাগসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কিছু পদ শূন্য রয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, শূন্য পদগুলোতে সংশ্লিষ্ট কমিটির ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা পদের নেতাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বিএনপির জন্য এখন সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিভিন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি। জানা গেছে, বিএনপির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে অন্তত ৭২টিরই শেষ হয়েছে মেয়াদ।
এ প্রসঙ্গে তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সংগঠনের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগসূত্র তৈরি করে এই জেলা কমিটিগুলো। তাই কাউন্সিলের আগে মেয়াদোত্তীর্ণ এসব কমিটি ভেঙে নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে। বিএনপির পুনর্গঠনের এই ডামাডোলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। দায়িত্ব ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ছাত্রদলের বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিয়েছিলেন বিদায়ের বার্তা। সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের নাম পৌঁছেছিল বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে। তার সঙ্গে বর্তমান দুই শীর্ষ নেতার দেখা করার পরপরই নতুন কমিটি ঘোষণার কথা ছিল কিন্তু এরপর প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও ঘোষণা আসেনি।
অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী যুবদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ বাকি আরও আট মাস। কিন্তু এখনই নেতৃত্বে পরিবর্তন বা পুনর্বিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংগঠনটি আরও সক্রিয়, তৃণমূলমুখী ও সামনের নির্বাচনি রাজনীতির জন্য উপযোগী করে তুলতে নেতৃত্বের পরবর্তী ধাপ নিয়ে এ আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সংগঠনকে আরও সক্রিয় ও তৃণমূলমুখী করতেই নেতৃত্বের পরবর্তী ধাপ নিয়ে ভাবছে হাইকমান্ড। যদিও যুবদলের বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, মেয়াদ শেষ না হওয়ায় এখনই পরিবর্তনের গুঞ্জনকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে জেলা পর্যায়েও যুবদলের নতুন কমিটি গঠনের কাজ চলছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক জটিলতা এড়াতে দ্রুত কমিটিগুলো কার্যকর করতে চায় বিএনপি। একাধিক নেতা একই পদে প্রার্থী হতে চাইলে যেন দলীয় কাঠামোর মাধ্যমে তা নিষ্পত্তি করা যায় সেদিকে নজর দিচ্ছে কেন্দ্র। পাশাপাশি, অতীতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কৃত নেতা-কর্মীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে পুনরায় দলে ফেরানোর বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় নেতাদের সাংগঠনিক যোগ্যতা, স্থানীয় বিরোধ ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও ২০১৬ সালের ১৯ মার্চের পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে। বিগত সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মামলা-হামলার কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে দাবি নেতাদের। এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি পাল্টেছে। তবে কাউন্সিলের নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরের শেষ দিক থেকে শুরু করে ২০২৭ সালের প্রথম ভাগের মধ্যে কাউন্সিল হতে পারে। রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, দিনক্ষণ নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্ধারণ করবে, তবে তা খুব শিগগিরই হবে। অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আসাদুল্লাহ আসাদ বলেন, ক্ষমতায় আসার পর দলের বহু জ্যেষ্ঠ নেতা সরকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে যুক্ত হওয়ায় দলীয় কার্যক্রমে কিছুটা মন্থরতা তৈরি হয়েছে। তাই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা দলের জন্য বড় এক পরীক্ষা। আসন্ন দলীয় কাউন্সিলের আগে তৃণমূলের সংগঠনের কর্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বছরের পর বছর কাউন্সিল না হওয়া। বিগত দেড় যুগ ধরে বিরোধী দলে থাকায় এবং দমন-পীড়নের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দলটির পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। তৃণমূলের নেতারা বলছেন, অনেক জেলা ও উপজেলায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ আঁকড়ে ধরে আছেন। এর ফলে মাঠপর্যায়ে কোনো নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। বিগত বছরগুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে থেকেছেন, রক্ত দিয়েছেন, হাজার হাজার মিথ্যা মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন, দলের ভেতরে মূল্যায়ন না পাওয়ায় তাদের মধ্যে চরম হতাশা দানা বেঁধেছে। তারা বলছেন, নিয়মিত কাউন্সিল না হওয়ায় অনেক জায়গায় কেন্দ্রের প্রভাবশালী নেতাদের ‘পকেট কমিটি’ দিয়ে দল চালানো হচ্ছে। এর ফলে মূল ধারার ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন এবং স্থানীয় পর্যায়ে উপদলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। তাই আসন্ন নির্বাচনের আগে এই স্থবিরতা ও কোন্দল মেটানোই দলটির প্রধান লক্ষ্য উচিত বলে মনে করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে বিএনপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। সেজন্য দলকে ঢেলে সাজানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্রমান্নয়ে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলা হবে। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক প্রতিকুল পরিবেশের কারণে নিয়োমিত কাউন্সিল হয়নি। অনেক পদ শুন্য রয়েছে আবার কেউ কেউ বহিস্কার হয়েছেন এগুলো আগে পূরন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক গোলাম হাফিজ বলেন, বিএনপির জন্য নিজেদের গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ স্থানীয় নির্বাচন। স্থানীয় নির্বাচনের আগে দলকে ঢেলে সাজানোই বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করতে না পারলে সরকার ও বিরোধীদলের আন্দোলন মোকাবেলায় বিএনপিকে মাশুল দিতে হবে।


