কৃষি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান উপকরণ সার। সময়মতো এবং ন্যায্যমূল্যে সার না পেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হয়, বাড়ে চাষের খরচ এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে বাজার ও ভোক্তার ওপর। অথচ কৃষকের জন্য বরাদ্দ সরকারি সার যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের গুদামে অবৈধভাবে মজুত থাকে এবং উচ্চমূল্যে বিক্রির প্রস্তুতি চলে, তা শুধু একটি আইনভঙ্গের ঘটনা নয়Ñএটি কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও সরাসরি আঘাত। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সাম্প্রতিক দুটি অভিযান সেই উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে। শনিবার হাসাদাহ বাজারে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৩২০ বস্তা ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার জব্দ করেছে পুলিশ। অভিযোগ, লাইসেন্স ছাড়াই উচ্চমূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব সার মজুত করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে এবং একটি দোকানের তিনটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে। এর মাত্র এক দিন আগে জীবননগর শহরের দত্তনগর সড়কের একটি দোকান থেকে ৪০৩ বস্তা সরকারি ডিএপি সার জব্দ করেছিল উপজেলা প্রশাসন। সেখানেও অভিযোগ ছিল, লাইসেন্স ছাড়াই সরকারি সার মজুত করা হয়েছিল। দুই অভিযানে মোট ৭২৩ বস্তা সার জব্দের ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ, প্রশ্নটি শুধু কত বস্তা সার উদ্ধার হলো, সেটি নয় বরং এই সার কোথা থেকে এল, কার মাধ্যমে এল, কীভাবে সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে অবৈধ মজুতের পর্যায়ে পৌঁছালÑএসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি। খুচরা পর্যায়ের একজন ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় ফাঁক রয়েছে, তা চিহ্নিত করা। কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার কোনোভাবেই মুনাফাখোরির পণ্য হতে পারে না। সরকারি ভর্তুকির সার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই সার গোপনে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে কৃষক বাধ্য হন বেশি দামে সার কিনতে। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে সরকারি ভর্তুকির সুফল চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করেন কৃষক এবং সাধারণ মানুষ। এ কারণে শুধু অভিযান পরিচালনা করে সার জব্দ ও মামলা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জব্দ করা সারের উৎস, সরবরাহের রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ডিলার ও পরিবেশকের হিসাব এবং মজুতের বৈধতা খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে বৈধ সার ব্যবসায়ীদের মজুত ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে। সরকারি সারের বস্তা কোথায় যাচ্ছে, কত পরিমাণে বরাদ্দ হচ্ছে এবং কৃষকের হাতে কতটা পৌঁছাচ্ছেÑএই পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কৃষি মৌসুমে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান নয়, নিয়মিত বাজার তদারকি ও মজুত যাচাইয়ের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে ডিজিটালভাবে ডিলার পর্যায় থেকে কৃষক পর্যায় পর্যন্ত সারের সরবরাহ ও বিক্রির তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এতে অস্বাভাবিক মজুত বা সরবরাহের অসঙ্গতি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আইনের প্রয়োগে কোনো ধরনের শিথিলতা থাকা উচিত নয়। সরকারি সার অবৈধভাবে মজুত, পাচার বা বেশি দামে বিক্রির সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ব্যবস্থা যেন শুধু ছোট পর্যায়ের ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে অবৈধ মজুতের পেছনে কোনো বড় সরবরাহকারী, মধ্যস্বত্বভোগী বা অন্য কোনো চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। জীবননগরে ধারাবাহিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ সার জব্দ হওয়ার ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায় এবং কীভাবে তা দূর করা যায়Ñসেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং কৃষি উৎপাদনের স্বার্থে এখন প্রয়োজন আরও কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ। সরকারি সার কৃষকের জন্য, কোনো অসাধু ব্যবসায়ীর গুদামের জন্য নয়। কৃষকের প্রাপ্য সার কৃষকের হাতেই পৌঁছাতে হবেÑএটি নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব। জীবননগরের সাম্প্রতিক অভিযান সেই দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তাই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।


