নিজস্ব প্রতিবেদক:
চুয়াডাঙ্গায় বাস শ্রমিকদের ওপর হামলা ও মহাসড়কে বাস আটকে রাখার অভিযোগে ডাকা অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট ১৭ ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করা হয়েছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফের আশ্বাস এবং মালিক-শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর গতকাল সোমবার রাত ১১টার দিকে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর রাত থেকেই চুয়াডাঙ্গার আন্তঃজেলা পাঁচ রুটে বাস-মিনিবাস ও দূরপাল্লার যান চলাচল শুরু হয়। এর আগে গতকাল সোমবার সকাল ছয়টা থেকে ধর্মঘট শুরু হওয়ায় দিনভর চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। বিশেষ করে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও দূরপাল্লার যাত্রীদের অনেকেই গন্তব্যে যেতে পারেননি। বিকল্প হিসেবে ইজিবাইক, ভ্যানসহ ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে অনেককে বাড়তি সময় ও ভাড়া গুনতে হয়েছে। এদিকে, বাস ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে চুয়াডাঙ্গা শহরে মাইকিং করে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারে বলা হয়েছে, জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফের আহ্বানে আগামী তিনদিনের জন্য বাস ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলো।
বাস মালিক-শ্রমিক নেতারা জানান, গত রবিবার চুয়াডাঙ্গার ফকিরপাড়ায় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকচালকদের সঙ্গে লোকাল বাসশ্রমিকদের বিরোধের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে বাসশ্রমিকদের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে। পরে ইজিবাইকচালকেরা মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে বাস থামিয়ে রাখেন বলে দাবি করেন বাস শ্রমিকেরা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বাস আটকে রাখার ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এর প্রতিবাদে সোমবার সকাল থেকে পাঁচটি আন্তঃজেলা রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। ধর্মঘট শুরুর পর বাস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, ভ্যান-রিকশাসহ অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধ এবং বাসশ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। দাবি পূরণ না হলে মঙ্গলবার ভোর ছয়টা থেকে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকাসহ দূরপাল্লার বাসও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ে জরুরি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ, বাসশ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের পরিবহন সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হয়। সভায় জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি হাসান ইমরান বকুল সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য দেন জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈনুদ্দীন, চুয়াডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, জেলা মোটরযান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলামসহ মালিক ও শ্রমিক নেতারা। ওই সময় শ্রমিক নেতারা বলেন, ইজিবাইক ও বাসচালকদের বিরোধ মীমাংসা এবং মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধের বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে তারা একাধিকবার আলোচনা করেছেন। কিন্তু কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ ধরনের সমস্যা চলে আসছে বলেও তারা দাবি করেন।
তবে গতকাল সোমবার রাতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা বৈঠকে বসেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক শরীফুজ্জামান শরীফের নির্দেশনায় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম পিটুসহ নেতারা অটো মালিক ও বাসশ্রমিকদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেন। পরে শরীফুজ্জামান শরীফের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনভোগান্তির কথা বিবেচনায় নিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহারে সম্মত হন শ্রমিক নেতারা। রাত ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।
চুয়াডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের ওপর হামলা ও মহাসড়কে গাড়ি আটকে রাখার প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল। জেলা পরিষদের প্রশাসকের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন থেকে সব রুটে বাস চলাচল করবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে। জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রিপন মণ্ডল বলেন, জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে এবং সমস্যার সমাধানের আশ্বাস পাওয়ায় শ্রমিক নেতারা অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন।
বৈঠকে বাস মালিক সমিতির পক্ষে হাজি আবুল কালাম আজাদ, হাসান ইমাম বকুল, মঈন উদ্দিন মুক্তা, খসরুজ্জামান ও আবু বক্কর এবং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ও সাধারণ সম্পাদক রিপন মণ্ডলসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সকাল থেকে বাস চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তির শিকার যাত্রীরা ধর্মঘট প্রত্যাহারে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। মেহেরপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা সোনিয়া খাতুন বলেন, প্রতিদিন সকালে বাসে কর্মস্থলে যান তিনি। বাস বন্ধ থাকায় সোমবার কর্মস্থলে যেতে না পেরে তাকে বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছে। যাত্রী সাইদুর রহমান বলেন, বাস না চলায় বিকল্প হিসেবে ইজিবাইকে যেতে হয়েছে। এতে সময় ও খরচÑদুটিই বেশি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।
ধর্মঘট প্রত্যাহারের পর রাত থেকেই পাঁচটি আন্তঃজেলা রুটে বাস-মিনিবাস চলাচল শুরু হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। একই সঙ্গে মঙ্গলবার ভোর থেকে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, সেটিও আর কার্যকর হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের ইজিবাইক ও বাসশ্রমিকদের বিরোধের স্থায়ী সমাধান এবং মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরানো না গেলে ভবিষ্যতে আবারও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের উদ্যোগে দুই পক্ষের বিরোধের স্থায়ী সমাধান হবে এবং কোনো পক্ষের কর্মসূচির কারণে তাদের আর দুর্ভোগে পড়তে হবে না।


